বেড়াতে গিয়ে মজারু ৫৬
বেড়াতে গিয়ে মজারু ৫৬
কোলাঘাটের হোটেল বলো এখনকার কায়দার রিসর্ট বলো ; সে এক এলাহি কায়দাবাজির খাসমহল। কায়দা আগে থাকলেও খানিক খানিক ঘরোয়া ভাবও ছিল বা ; সে সবের পরোয়া না করে পুরো দস্তুর পর পর ভাবের বাতাবরণ হয়েছে দেখলাম। পৌঁছে গেলাম সেথায়। রিসেপশনে ফ্যাশন সো হচ্ছে নাকি দ্বিধা দ্বন্দে মন দোদুল্যমান হল। কিছু পরিধেয় দেখে ব্যোমকে চমকে ট্যারা হয়ে গেলাম। দেখলাম,বুঝলাম ও জানলাম যে এখনকার হিসেব মতন আধুনিক হওয়া আমার আর হলো না। তবে আমার থেকেও ওজনদার মহিলা ধরাধাম আলো করছে দেখে আগের ভাবনায় যতটা মুষড়ে পড়েছিলাম সেটা কেটে গেল। তবে ওজনদার মহিলা গণের সাহসী পোশাক পরার ব্যাপারটা বেশ চলমান হয়েছে তার জ্ঞান প্রাপ্ত হলাম।
মধ্যে মধ্যে সময় বয়ে গেল । আমরা ঘরের দখল পেলাম। পাশাপাশি। আমার তখন আরেক রাউন্ড ক্ষিদে চাগিয়ে উঠেছে। সাথের বাকিদের সঙ্গ গুণ নয় তো কম খেয়ে রওনা হওয়ার দরুণ তখন পেটে আগুন জ্বলছে। ঘরে দেড় দিনের সংসার সাজিয়ে গুছিয়ে কিছু তাৎক্ষণিক খাবারের অর্ডার দিয়ে আমরা বাহিরে পুলে র দিকে যেতে মনস্থ করলাম। যদিও আমি স্থলে স্বচ্ছন্দ সব চেয়ে বেশি। কিন্তু পড়েছি যে যবনের হাতে ; রক্ষে যে নেই তা জানতাম ১৬ এর জায়গায় ১৮ আনা। কারণ বছর তিনেক আগে ডায়মন্ড হারবারে রিসর্ট পূন্যলক্ষ্মীর পুলে ঘেঁটি ধরে নামিয়ে দিয়েছিল দেবাশ্রিতা। এবার কাকুতি মিনতি করতেই রীতিমতো থ্রেট .... " নামবে না মানে ? ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেবো না তাহলে !!! " বলার চেষ্টা করলাম " সাঁতার জানি না তো !!! " উত্তর এলো চট জলদি ...." আমি কৌন সা সাঁতার জানি !!"
হরে রামো !!! এই জন্যই কাশ্মীর ঘুরতে গিয়ে ডাল লেকে নামিয়ে দেয়নি। ভাগ্যিস !!! জয় মা !!!
যথা সময়ের আগে ভাগেই খাবার এল । আমাদের ক্ষিদের আঁচ ওনারাও পেয়েছিলেন । সপ্তাহান্তে এমন খাই খাই বাই যুক্ত বোর্ডার সামলাতে এরা যারপরনাই যে দক্ষ তা বোঝাই হয়ে বুঝে , পেট শান্ত করে একে একে সবাই পুল মুখী হলাম। চার সাঁতার জানা জলীয় প্রাণী সহ বাকি তিন আনাড়ি নাকি আধা আনাড়ি ? আমাদের দুই গিন্নি র সাঁতার পোষাক নেই আর পুলে সে পোশাক must ... অগত্যা দুজন পোশাক খরিদ করে নাকের জলে চোখের জলে হয়ে জলে নেমে পড়লাম । বাপরে জল দেখতে ওমন সোজা সরল স্বচ্ছ দেখালে কি হবে ? চাপ দিতে ওস্তাদ !!!
প্রথমেই মনে হল ডুবে গেল কি হবে ? জলচারীরা জলের মধ্যেই ছিল ছড়িয়ে ছিটিয়ে ; কি কান এঁটো করা হাসি তাদের !!! এদিকে জলের চাপ সইয়ে নিয়ে টলোমলো করে টাল খেতে খেতে পুলের বাঁধানো পাড় ধরে ধরে প্রায় প্রায় গলা জলে হাঁটা হাঁটি করলাম বিস্তর। তা দেখে তেনারা জলের মধ্যেই হেঁসেই খুন । দলের জলচারীরা তখন জল তোলপাড় করে কেরামতি দেখাতে লেগে পড়েছে। আমিও তখন water walking এ বেশ মজা পেয়ে আমার হাত ধরে জলে নিয়ে চলো সখা style এ পুলের ভিতরে চলা শুরু করেছি ; কিন্তু একটু পরেই দেখি জল আমার থুতনি মুখী । হেনকালে অতর্কিতে কর্তা মশাই পা ধরে , পেটের কাছে সাপোর্ট দিয়ে আমাকে
জলে ভাসিয়ে রেখে পা দুখান চালানোর নির্দেশ দান করল । নিরুপায় আমি খানিক পা ছোড়াছুড়ি করার পর বেশ মজা পেলাম। সাহস করে জলের নিচে জীবনে প্রথম ডুব দিয়ে উঠলাম। নাকে জল চোখে জল ..... নাকের ভিতর জ্বলুনি !!! শেখার বয়স নেই জানি । তবে সময়ের সাথে সাথে অনেক কিছু হয়ে ওঠে না। ঘুরতে এসে জলে ঝপাং এর মজা এবার প্রথম টের পেলাম। ওদিকে দেবাশ্রিতা আমারই মতন ধারে ধারে ও ধরে ধরে জলে ঝপাং এর মজা নিল। জলীয় জ্ঞানের হাতেখড়ি না হলেও কিছু দেখা শোনার সুযোগ হল। জলে ভাসমান টায়ার যে ওমন ওজনদার তা কে জানতো ? হাফ সেঞ্চুরির কাছাকাছি এসেও দেখছি কতো কম জানি।
পুলে নামার আগে ভাগে যখন খাই খাই বাই তে খাবার চাপাচুপি দিচ্ছিলাম , তখন পুল থেকে ওঠার পরের দুপুরে ফাইনাল খ্যাটনের অর্ডার দিয়ে ই রেখেছিলাম সবার ইচ্ছে মতন । পুল থেকে উঠে সবাই ঘর মুখী হলাম। এরপর স্নানের পাট চুকিয়ে সকলে পিলপিলিয়ে চললাম খাবার ঘরের দিকে। জলে দাপাদাপি করলে দুরন্ত ক্ষিদে চাগিয়ে ওঠে । এ তো সবার জানা। সকলেই তখন শেষ দুপুরে যারপরনাই ক্ষুধার্ত । কাজেই সকলে ভাত, ডাল , স্যালাড , নিরামিষ - আমীষ , ভাজা – ভাপা, কষা, রসা সব দিয়ে চেটে পুটে পেট পুজোর পর নদীর ধারে খানিক ঘুরেঘারে ঘরে চললাম একটু গড়িয়ে নিতে। সেই গড়ানো শুরু হতে তা গড়িয়ে গড়িয়ে গভীর ঘুমে ডুবে গেল। ঘুম যখন ভাঙল দেখি ; সন্ধ্যা নেমেছে। নানান রকম আলোর রোশনাইতে সোনার বাংলা রিসর্ট তখন সেজে উঠেছে। আমার কন্যার, ঘরকে আড্ডা ঘর করার ইচ্ছে তে জল ঢেলে আমরা সবাই ওই মায়াবী সোনালী আলোয় আলোকিত সোনার বাংলা র বাগানে জড়ো হলাম। নানা গড়নের চেয়ার দোলনা র মাঝে ভাগাভাগি করে আমরা আর ওরা বসে নানান গল্পে মেতে উঠলাম। সান্ধ্যকালীন অল্প বিস্তর খ্যাটন পর্ব মিটিয়ে আমরা হাঁটি হাঁটি পা পা করে পুরো চত্বর পরিদর্শন করে শেষ প্রান্তে এক ছাদ ঘেরা চারপাশ খোলামেলা বসার জায়গায় জিরোতে বসে গেলাম। টুকটাক বেড়ানোর গপ্পের ফাঁক গলে পড়াশোনা র কথা ঢুকে পড়ছিল যদিও; সে ঘাঁটি আঁকড়ে ধরতে পারেনি। সব জায়গাতেই তার একটা স্থান মাহাত্ম্য থাকে। তাকে ছাপিয়ে ওঠা মুশকিল। যেমন স্কুলের পরিবেশে কোনমতেই আমরা বেরোনোর হারিয়ে যাওয়া মনকে খাপ খাওয়াতে পারব না !!! এ ঠিক তেমন। মা সব সময় বলতেন , যখনকার যা ; তখন ঠিক তা করাই বাঞ্ছনীয়। তা না করা হলেই অনেক ক্ষেত্রে সব তালগোল পাকিয়ে যায় বৈকি !!! এত এত আলোর স্বপ্ন পুরী র মায়াবী রূপ থাকলেও, তাতে পাশের বয়ে যাওয়া নদীকে ঢেকে দিয়েছিল। একবার দীঘার সমুদ্রে মাঘী পূর্ণিমা র রূপ দেখেছিলাম। সে যে কি অপূর্ব বলে বোঝাতে পারব না । সেখানেও হোটেলের আলোকসজ্জা র কামাই ছিল না , যা প্রকৃতির রূপকে চেপেচুপে একাকার করেছিল । আমি , সত্য দা আর মঞ্জুশ্রী চলে গিয়েছিলাম সমুদ্র সৈকতে , যেখানে কৃত্রিম আলোর ঝলকানি পৌঁছায় না। সেখানে দেখেছিলাম প্রকৃতির নিজের স্নিগ্ধ রূপ। যা মনকে শান্ত করে ।
আমরা ঘোরাঘুরি আর গল্প সামলে সোজা খাবার ঘরে চলে এলাম। সময় তখন অনেকটা এগিয়ে গেছে , তারপর সবাই লেগে পড়লাম ডান হাতের কাজে। দিনটা কেমন টুক করে শেষ হয়ে গেল ... তা ভাবতে ভাবতেই ঘরে ফিরে এলাম খাওয়া দাওয়া সেরে। এবার ঘুম । তবে পরের দিন ফেরার পথ না ধরে আমরা হব সমুদ্র সৈকত মুখী এই ভাবনা তে তা দিতে দিতে নিদ্রা মগ্ন হলাম। ঘরে একখান জোড়া খাট ছাড়াও একখান একাকী সোফা ছিল। কন্যার বাবা সাধারণত একা নিজের মতন সেখানে লম্বা হন বেড়াতে গেলে। এবারে তাতে জবরদখলকারী কন্যার কাছে হার মেনে গুটি গুটি এ ধারে হাজির হলেন তিনি ।তেনার নাকের ডাকাডাকি উৎকণ্ঠা জনক হলেও এখন আমার নাকও জবাব দেয় বেশ !!! তাই উত্তর প্রত্যুত্তরে রাতের শেষে আরো এক নতুন দিনের সূচনা হল।
@শুচিস্মিতা
ভদ্র
Comments
Post a Comment