বেড়াতে গিয়ে মজারু ৬৭

 বেড়াতে গিয়ে মজারু ৬৭

কোয়াম্বাটর হোটেলে  পৌঁছে আমরা শুরুতে যে যার ঘরে ঢুকে পড়লাম লটবহর সহ।সারাদিনের ক্লান্তি কাটাতে তখন অতি অবশ্যই যে পানীয়ের জন্য মন প্রাণ কাঁদছিল, তা আমার ক্ষেত্রে চা না হয়ে যায় না।আর অবশ্যই আমার পছন্দের পারা যে বাঁধা আছে দুধ দিয়ে ঘনো করে ফোটানো আদি অকৃত্তিম দুধ চায়ে,তা বলাই বাহুল্য। কিন্তু কোয়াম্বাটরে ওদিকের কাউকে কিছু বোঝানোর ক্ষেত্রে প্রধান অন্তরায় ভাষা।এ উটির মতন দেশী বিদেশী পর্যটকদের আনাগোনা সমৃদ্ধ পর্যটন কেন্দ্র নয়,কাজেই চা খেতে চেয়ে বেজায় চাপে পড়ে গেলাম। হোটেলের রান্নাঘর থেকে যে চায়ের অর্ডার নিয়ে গেল,তার নানান ডিরেকশনে মাথা হেলানোতে আমরা যারপরনাই সন্দিগ্ধ হয়ে গেলাম।কিছু পরে শান্তশ্রী দি রান্নাঘরে হানা দিয়ে আপাতত খান দুয়েক ভাষা ও সাংকেতিক ভাষার প্রয়োগে অর্ডার গ্রহণকারীর হেলানো মাথার পাঠোদ্ধার করে ঘরে এসে জানান দিল... সকাল ছাড়া চা মিলবে না মোটেও। যখন তখন চা পিনা মানা হ্যায়। আজব !!! আমরা যখন তখন চা খাই , খেতে দিই। কফি চাইলে হয়তো দিলেও দিতে পারত... এদিকে চায়ের থেকে কফি বা কাপিই (সাউথ ইন্ডিয়ান উচ্চারণে)র আদর কদর বেশির দিকে,যদিও চা বাগানের সমুদ্দুর পেরিয়ে আমরা ওদিকে পৌঁছে ছিলাম। কফি চেয়ে পুনরায় ওই ভাষা বোঝার আর বোঝানোর জট না পাকিয়ে রাতের খাবার খেতে হোটেলের নিচের খাবার ঘরে গেলাম, মনে তখন ভয়ানক চিন্তা আর পেটে ভয়াবহ ক্ষিদে,কারণ  ভরপুর দুপুরের খাবার সেদিন আমাদের কপালে জোটেনি... এ দিকে এক কাপ চা বোঝানোর থেকে এত জনের গোটা ডিনারের মেনু বোঝাতে আমরা তো গেনু (গেলাম) হয়ে যাব,রাত গড়িয়ে গেলে ???? পড়েছ যবনের হাতে টাইপ নিরুপায় হয়ে মেনু বোঝাতে লেগে পড়ে দেখা গেল,ঘরের অর্ডার গ্রহণকারীর থেকে এর ভাষার দখল কিঞ্চিত বেশি, ওই ১৯/২০, কিন্তু মুখের অভিব্যক্তি আশা ব্যঞ্জক নয় আদেও... আর মাথার হেল দোলের ধরন আগের জনের মতন অবিকল এক। তবে যখন অর্ডার মাফিক খাবার আমাদের দলের সামনের টেবিলে হাজির হল... বুঝলাম এখানকার অর্ডার গ্রহণকারী much better.... যদিও পরেরদিন দুপুরে সে ভাবনা বদল করতেই হল.... সে গপ্পো পরে বলছি।খাবার খেয়ে যে যার ঘরে,কথা মতন পুপে অন্বেষার ঘরে ঘুম দিতে গেল।পরের দিন আমাদের এইবারের ঘুরুবেড়ুর শেষতম দিন আর সেদিনও সারাদিনের বোঝাই প্ল্যান প্রোগ্রাম।

পরেরদিন ভোরের আলো ফোটার আগেই ঘুম ভাঙ্গলো এক বিচিত্র শব্দে। ঘুম ভাঙ্গার পরে ঘুমের ঘোরের ঘোরাঘুরি চলে,সেই ঘোর কাটার পর শব্দটা চিনতে পেরে ভারি অবাক হলাম!!!!উঠে পড়ে হোটেলের ঘরের লাগোয়া বারান্দায় হাজির হয়ে এদিক ওদিক তাকিয়ে শব্দের উৎসের দেখা না পেলেও, আবার শুনতে পেলাম সেই শব্দ,বলা ভাল সেই ডাক,যা জনবসতি পূর্ণ লোকালয়ে সত্যিই অবাক করার মতন‌ই.... আবার ডেকে উঠল অজানা উৎস থেকে কেকা ধ্বনি। অনেক উঁকি ঝুঁকি দিয়েও কিছু দৃশ্যমান হল না। তখন দিনের আলো ফোটেনি,অগত্যা আবার ঘরে ফিরে শুয়ে নিদ্রা গেলাম।এই হোটেলেরও গদির বাহার এক‌ই সুরে বাঁধা। কষ্ট দায়ক তো বটেই, কিন্তু পরন্তু একটাই ভাল কথা যে সেদিন মাঝ রাতেই আমাদের ফিরে পড়তে হবে । 

এদিকে বেড়াতে আসার আগেভাগেই জানা ছিল চন্দন সাবান, চন্দন ধূপ , মাইসোরের শাড়ির বাহারের গপ্পো।জানা ছিল না যা,তা হলো কোয়াম্বাটর নাকি দক্ষিণ ভারতীয় ম্যাঞ্চেস্টার নামে খ্যাতি প্রাপ্ত। জেনেছিলাম আমাদের এক পারিবারিক বন্ধুর কর্তা মশাই এর থেকে। আমার বন্ধুটি যদিও বাঙালি,তার অর্ধাঙ্গ (অর্ধাঙ্গিনী এর বিপরীত হিসেবে ভাবতেই পারো)শরৎ দা কেরালার বাসিন্দা। যদিও তার জন্ম কর্ম সব কলকাতাময়।বাংলা ভাষা আর রবীন্দ্র সংগীত শুনে শরৎদাকে কেউ ভাবতেও পারবে না দক্ষিণ ভারতীয় বলে।সেই শরৎ দা অবশ্য করে সুতির শাড়ি কেনার আগাম পরামর্শ দান করে রেখেছিল।তখন জেনেছিলাম কোয়াম্বাটরের সুতির শাড়ি খুব নামডাকধারী।যদিও সিল্ক‌শাড়ি ভি হ্যায় উধার।

সকালে অন্যদিনের মতন হুড়োতাড়া না করে অন্য দিনের থেকে সামান্য পরে চায়ের অর্ডার দিলাম, এক বাক্যেই অর্ডার বুঝে চলে যেতে শান্তি পেলাম.... কিন্তু খানিক পরে চায়ের বদলে কফি পান করে দিন শুরু করেই ফেললাম.... আই আই ও !!!! খানিক পরে জানতে পারলাম সকালের শোনা কেকা ধ্বনি ভুল নয়... হোটেল চত্বরে আছে একজোড়া পোষা ময়ূর আর ময়ূরী। তামিলনাড়ু ট্যুরিজমের হোটেলটি জনবহুল শহরের মধ্যে হলেও বেশ বড় ‌এলাকা নিয়ে গড়ে উঠেছে। ঠিক হল সকাল সকাল জলখাবারের পর্ব শেষে আমরা যাব চোল রাজত্বের সময়ে কোন এক চোল শাসকের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত মন্দির দর্শনে।তার শেষে হোটেলের কাছের মার্কেটে কেনা কিনি করে হোটেলে ফিরব।পরবর্তী ঘোরা,আমাদের এবারের শেষতম আকর্ষণ পানে বিকেলের দিকের একটু আগেভাগেই বেরনোর কথা স্থির হল ,কারণ সেখানে পৌঁছে সব দেখে ফিরে আমরা বেড়ানোর ইতি টানব। তারপরেই শুরু হবে এয়ারপোর্টে  যাওয়ার গীতিকা।

কন্যার ইতিহাস ব‌ইতে ভরে আছে নানান রাজত্বের উত্থান পতনের মহাভারত।সদ্য পড়েছে চোল রাজত্বের গল্প গাঁথা।অত‌এব মন চলো চোল শাসকের প্রতিষ্ঠিত মন্দির পেরুর-পট্টেশ্বর মহাদেব মন্দিরে। ক্যামেরা সাথে নিয়ে যাওয়া মাঠে মারা গেল। ক্যামেরা তো ক্যামেরা মোবাইল ওবধি লেনা মানা হ্যায়।মন্দিরে দেব দর্শন করে নিয়ম মাফিক মন্দির প্রদক্ষিণ করে বেরনোর কিছু আগে মন্দির কতৃপক্ষের তরফের এক ব্যক্তি সন্দিগ্ধ দৃষ্টি ফেলে আমার পরিধেয় রোদচশমা খুলিয়ে তাতে hidden camera খুঁজতে লাগল ঝেড়েঝুড়ে। আমি প্রথমে ভেবলে গেলেও পরে ভারি মজা পেলাম !!! মন্দিরে সকলে ঢোকেন নি,আমরা কয়জন কতক ভক্তিতে ব্যাকুল আর কয়জন শিল্পকলা দেখতে আকুল হয়ে মন্দিরে সিধিয়েছিলাম ,বেরিয়ে বাইরের রোদে ভাজা ভাজা হয়ে ডাব খেয়ে শরীর মন ঠাণ্ডা করে পরবর্তী আকর্ষণ শাড়ির ভরা সংসারে নিজেকে হারাতে হাজির হলাম।

ওতো শাড়ি দেখে তার থেকে মোটে একটা বাছতে হবে ভেবেই মনটা ভার হয়ে গেল কেমন যেন,একখান কিনে দেবে বলে কয়ে নিয়ে এসেছেন তিনি !!! দু খানের একখান আমার পছন্দ, অন্য খান তেনার , আমি তো আবার আশায় মরে চাষা যদিও, তাও আশা আছে ,ভালবাসা আছে‌.... শাড়ির প্রতি ভেবে অনেক আশা নিয়ে দুখান গায়ে ফেলে আয়না মুখী হয়েছি বটে। কিন্তু !!!! ভবি ভোলার নয়, একেই স্থির।হেনকালে হাল ধরল শান্তশ্রীদি। বললে.... " তোকে তো প্রতি পূজোতে কিছু না কিছু দিয়ে থাকি।এটা পরের পূজোর আগাম উপহার করে দিই। কেমন !!!! "সমস্যার দারুণ সমাধান।আমি তখনও দুখান শাড়ি গায়ে চেপে দাঁড়িয়ে ছিলাম। এরপর দেবাশ্রিতার পারিবারিক লিস্টি মোতাবেক শাড়ির ব্যাগ ভারি হতে থাকল,হোটেল ফেরত গিয়েছিল অনিন্দ্য সহ তিন কন্যা। হোটেল থেকে ফোনে অনুরোধের আসর আরো শাড়ি যুক্ত হতে হতে এক সময় সব কেনাকাটা শেষ হলে আমরা গড়ানো বেলাতে দোকান থেকে বেরলাম,তবে হোটেলে না গিয়ে শেষতম কেনাকাটা করতে কাছেই মিষ্টির দোকানে সকলে ঢুকে পড়লাম। ওখানকার মাইশোর পাক না খেলেই নাকি নয়.... কিন্তু বাছাবাছি (এক এক মানের মাইশোর পাকের এক এক দাম) শেষ করতে না করতেই আকাশে মেঘেরা পাক মেরে বৃষ্টি হয়ে ঝরে পড়ল। দোকান থেকে হোটেলের দূরত্ব কম হলে কি হবে, সবার হাত ভরিয়ে তখন শাড়ি,মিষ্টির এলাহী আয়োজন।সাথের ব্যাগজাত ছাতা যদি বা কষ্টে আত্মপ্রকাশ করল,তাকে সবাই মাথায় ধরব কেমনে?ছাতার সংখ্যাও আমাদের টিমের তুলনায় টিমটিমে।তবে প্রসস্ত রাজপথের মাঝ বরাবর আমাদের কলকাতার মতন ওভারব্রিজের আচ্ছাদন। কোনভাবে তার নিচে হাজির হতে পারলেই কেল্লা ফতে।এর মধ্যে আবার রামু দা নিজের জন্য মার্কেটিং করতে দলের থেকে বাইরে গেছে, সে আবার রাস্তা চিনতে গোল পাকায়ে,তাতে শান্তশ্রী দি চিন্তিত হতে হতেই ব্যাগ বোঝাই শপিং নিয়ে রামুদা ফোনের উত্তর দিয়ে হাজির হয়ে গেলেই , আমরা মাথা ঢাকা পথে সিধে হেঁটে হোটেল পৌঁছে গেলাম। সবার মাল পত্তর আপাততো আমাদের ঘরে এনে হিসেব নিকেষ করে আমরা গেলাম খাবার ঘরে... খেয়ে আমরা বেরিয়ে পড়ব ওদিকের নতুন সংযোজন ঈশা ফাউন্ডেশনের আদি যোগীকে ও তার সাথে যুক্ত আনুসঙ্গিক সবটা দেখতে।খাবার ঘরে আগাম পৌঁছে অতি ব্যস্ত বাগিস যারা সকলের সুবিধার্থে আগেভাগেই খাবার অর্ডার দিয়েছিল... একটু পরেই তারা প্রমাদ গুনে গুটিয়ে গেল,কারণ এক টেবিলে নানান সেরামিকের বাটি বাটি আমিষ পদ আর ভাত এলেও অন্য টেবিলে শুধুমাত্র এক প্লেট ভাতের সাথে কুট্টি কুট্টি স্টিলের বাটিতে বাটিতে নানান ধরনের অচেনা নিরামিষ পদ,যার অধিকাংশই আমাদের অপরিচিত তা হাজিরা দিচ্ছিল।এরপরে যেটা শুরু হল... তা টোটাল সার্কাস। নিরামিষ পদের পরে চিকেনের অর্ডার করা হয়েছিল,সেটা বুঝে না বুঝে  খান কতক কুট্টি বাটিতে ততোধিক কুট্টি কুট্টি চিকেনের টুকরো দেখে একবাক্যে সকলের মনে হল... এ চিকেন নির্ঘাত কাকের মতন ছোট আকারের বটে!!!! প্রথম এপিসোডের শেষের আগেই দেখলাম দ্বিতীয় এপিসোডে খাবার খাওয়ার ভাত কম থাকলেও তা ছিল,কিন্তু খাব কিসে ??No থালা at all। হিন্দি, English,সংকেত সবের প্রয়োগে একখান সেরামিক আরেকখান স্টিলের থালা পেলাম... নে এবার কত খাবি খা !!! মাথা পিছু দুখান করে থালাতে বাপু খাইনি এখনো ওবধি!!!! শেষে হেলানো মাথা আর কিংকর্তব্যবিমূঢ় খান কতক সার্ভিস বয়দের দেখে সত্যিই মায়া হল,না রাগ হয়নি,কারণ এমন নির্মল আনন্দ পেতে বয়সের সাথে সাথে ভুলেই গেছি কবে !!! অবশেষে সত্যিই শেষ হল আমাদের স্মরনীয় মধ্যাহ্ন ভোজ। আমাদের ভাষার অভিঘাত সামলাতে ওদের রেস্টুরেন্টের ম্যানেজার‌ ও হাজির হয়েছিলেন,কিন্তু তিনিও সুরাহা করতে তেমন পারেননি।এরপর যে যার ঘরে গিয়ে একটু জিরিয়ে বেরিয়ে পড়লাম আমাদের এ বারের ভ্রমণের শেষ গন্তব্য ঈশা ফাউণ্ডেশনের কর্মকাণ্ড ঘুরে দেখতে। গাড়ি চলতে চলতে শহুরে হট্টমেলা ছাড়িয়ে,নারকেল গাছের সারিবদ্ধ রুপ দেখাতে দেখাতে এগিয়ে চলল, একসময় আমরা ঈশা ফাউন্ডেশনের চত্বরের সামনে গাড়ি থেকে নেমে পড়লাম। নারকেল গাছ দেখতে দেখতে আমরা অনেকেই পরবর্তী গন্তব্য কেরালা করা যায় কিনা,তার ভাবনা ভেবে নিলেও,বাড়ি ফিরে ভাবনা ভারত জুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে। জড়ো করার সময় এখনো দূরে আছে, দেখা যাক .... 

এই বিশাল কর্মশালা দুদিকে দুভাগে বিভক্ত। প্রথমেই এক জায়গায় ব্যাগ ফোন জমা করার ব্যবস্হাপনা,কারণ এখানকার মন্দির চত্বরে ফোন , ক্যামেরা ও ব্যাগ কোনকিছু নিয়েই ভিতরে প্রবেশের অনুমতি নেই। আমরা যেদিকে ছিলাম তার বামে আরো খানিক এগিয়ে মন্দির আর ডানদিকে বিখ্যাত আদি যোগীর আবক্ষ মূর্তি। আদি যোগী হলেন আমাদের হিন্দুদের আদি পুরুষ মহাদেব,যিনি প্রথম যোগ আয়ত্ত করেছিলেন তাই তিনিই আদি যোগী।ব্যাগ দিতে আপত্তি না থাকলেও ফোন রাখা নিয়ে এক অসন্তোষ দানা বাঁধলো আর তার ফলস্বরূপ একমাত্র অনিন্দ্য ও পুচকু হিল্লোল সহ আমরা মহিলা মহল (কচি ,ধাড়ি সব)এগিয়ে চললাম মন্দির চত্বরের গোলোক ধাঁধায়। জুতো জমা করে অত্যন্ত প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত কর্মীদের তত্ত্বাবধানে সব কিছু দেখে ফিরে এলাম ব্যাগ ও মোবাইল রক্ষণ কারীদের কাছে। এবার পালা ছিল আদি যোগীর বিখ্যাত লেজার সো দেখার.... হাতের কিছুটা সময় আমাদের নিয়ে গেল কাছের এক  আইসক্রিমের স্টলে।খাওয়া সেরে আমরা গুটি গুটি চললাম লেজার সো দেখতে আদি যোগীর দরবারে। মাঝের ওই চত্বর থেকে আদি যোগীর মূর্তি ওবধি যাওয়ার তিন ধরণের উপায়। ১) আদি অকৃত্তিম হন্টন, ২) ব্যাটারি চালিত গাড়ি আর সব থেকে অভিনব হল ৩) বেশ বড়সড় গরুর গাড়ি । গাড়ির চালক বা গাড়োয়ানের চীৎকার, গরুর গলায় বাঁধা ঘন্টার টুং টাং, সর্বোপরি গোময়ের গন্ধ সব সমেত আমরা হন্টনে রত হলাম,কারণ দুই ধরনের গাড়ির লাইন বেশ লম্বাটে, যদিও দুই গাড়ির গতি মুখরতা দেখার মতন... সাওয়ারী নিয়ে যাচ্ছে আর সাওয়ারী ভরে ফেরত এসে আবার ভরন্ত হয়ে ফের যাচ্ছে। আমাদের দেশে লোকাভাব শত্রুর মুখে ছাই দিয়ে অটুট অক্ষুন্ন।আমরা টুক টুক করে আদি যোগীর মূর্তির সামনে হাজির হলাম, বিশালাকার মূর্তির সামনে নিজেদের ক্ষুদ্র মনে হল।দেখলাম অসংখ্য জনতা জনার্দন। তার প্রমাণ যদিও দুই ধরনের গাড়ির লাগাতার আসা যাওয়ার দরুণ দারুণ ভাবে আগেই বুঝে গেছিলাম।এক সময় আদি যোগীর মূর্তির সামনের প্রশস্ত চত্বরে ওখানকার কর্মকর্তারা দড়ির দাগ টেনে তার ভিতরে বসার নির্দেশ জারি করলেন।আমরা অসংখ্য  ভক্ত কূলের মধ্যে ও সাথে ধরাচূড়ো সহ ভুঁয়ে বসে পড়লাম।এরপরের গল্প ভয়ানক.... অগণিত ভক্ত, ভিন্ন ভাষার কলতান, তার মধ্যে সোনায় সোহাগা সম বরুণ দেবের হাল্কা আবির্ভাব হল। অত‌এব ষোলো কলা পূর্ণ করতে হাল্কা ছাতা খুলতেই হলো। তাতে পিছনের অডিয়েন্স ভয়ানক ভাষায় প্রতিবাদী হয়ে উঠল... হেনকালে অন্বেষা ও দেবাশ্রিতা ভয়ানক রেগে উঠে বেরিয়ে যাওয়ার ইচ্ছে প্রকাশ করলেও আখেরে বেরতে না পেরে বেশ বিরক্ত হল.... সব অপেক্ষার শেষ আছে রে পাগলা !!! হঠাৎ সব আলো নিভিয়ে দিয়ে শুরু হলো সেই বহু প্রতীক্ষিত লেজার শো।আমরা কম বেশি সকলে বসে পড়লেও আমার কর্তা মশাই একপাশে ঠাঁয় দাঁড়িয়ে ছিল,সে সেখান থেকেই মোবাইলে সমস্ত শো এর ভিডিও করল।বৃষ্টি খুব জোরে না পড়লেও,পুরো সময় তা থামল না।অনুষ্ঠান শেষে ফুলস্টপ পড়ল বৃষ্টিতে। আবার আলো জ্বলে উঠলো আর আমরাও গুটি গুটি জয়সনকে খুঁজে পেতে ওর বাহনে উঠে সময় মতন হোটেলে পৌঁছে গেলাম।এবারে ঘরে এসে কিছু গোছানো এগিয়ে রেখে খেতে গেলাম সকলে, এবারে মাথার হেল দোলকে খানিক খানিক বোঝার চেষ্টা জারি রেখে খাবারের অর্ডার দেওয়া হল আর সঠিক খাবার আসার পর আমরা রাতের খাবার খেয়ে জলদি জলদি ঘরে এলাম।বাকি গোছানো শেষ করে অল্পক্ষণ ঘুমের আরাধনা করে তাকে আনিয়ে নিয়ে ঘুম দিয়ে মধ্যরাতে উঠে পড়লাম।এরপর.... নিঝুম রাতে আমরা মালপত্র তুলে নিয়ে হাজির হলাম বিমানবন্দরে।সাথে ছিল মাইশুরু থেকে শুরুর দিনে হিল্লোলের জন্য কেনা সেই বেলুন। অনেক যত্নে আকাশ পথে তাকে নিয়ে কলকাতায় ফেরার ইচ্ছে যখন পূর্ণ হলো না,হিল্লোলের খুব কষ্ট হয়েছিল। কিন্তু কি আর করা, শেষমেষ বেলুন খান রয়ে গেল জয়সনের টোম্পো ট্রাভেলারে আর আমরা আকাশ পথে ফিরে চললাম কোয়াম্বাটর থেকে চেন্নাই হয়ে কলকাতার পথে। চেন্নাইতে একটু ছুটোছুটি করতে হয়েছিল, কারণ চেন্নাই থেকে কলকাতার ইণ্ডিগোর ফ্লাইট আগাম উড়বে বলে প্রস্তুতি নিয়ে শুধুমাত্র আমাদের ১১জনের জন্যই অপেক্ষায় ছিল , কারণ কোয়াম্বাটর থেকে আমরা ইণ্ডিগোর ফ্লাইটে চেপে খানিকটা অংশ সমুদ্রের ওপর দিয়ে এসে চেন্নাইতে নেমেছিলাম সঠিক সময়েই। কিন্তু পরবর্তি ফ্ল্যাইট আগে ভাগেই যাত্রা শুরু করতে চেয়েছিল। আমাদের জন্য অপেক্ষায় থাকার জন্য তারা আগাম উড়তে পারেনি।এরপরে যথা নিয়মে উড়ু উড়ু মন আর দুরু দুরু বুক নিয়ে ওদিকের আকাশ থেকে এদিকের আকাশ হয়ে আমার , তোমার সবার শহর কলকাতায় ফিরে এলাম।আজ তবে এই টুকু থাক... বাকি কথা পরে হবে।কি তাই তো ???


Comments

Popular posts from this blog

আক্কেল সেলামি

বেড়াতে গিয়ে মজারু ৬০