বেড়াতে গিয়ে মজারু ৬৬

 বেড়াতে গিয়ে মজারু ৬৬

উটিকে ছুটি করার মন কেমনের ভোর হল.... তবে এ কথাও ঠিক ওখানে আমরা মন ভরে ঘুরতেই গিয়েছিলাম। থাকতে যাইনি। তাই শুধু মাত্র সুন্দর স্মৃতিকে মনের মণিকোঠায় রেখে পরের গন্তব্যে এগিয়ে যাওয়াই শ্রেয়।কোথাও বসবাস করা শুরু করলে তার ভাল ও খারাপ সবটুকু গ্রহণ করে তাকে ভালবাসতে হয়,কিন্তু ঘুরতে গেলে ভাললাগার আশেপাশে যদি কোনকিছু খারাপের ছোঁয়াচ লাগে তা চিরকালের জন্য যেন দাগ রেখে যায়... যদিও এ আমার নিজস্ব ভাবনা।

গম্ভীর কথাকে বাদ দিয়ে আসলে নকলে কথা এই যে,সেদিন আমাদের উটিকে এবার তবে যাই বলে বেরিয়ে যাওয়ার কথা এই দাক্ষিণাত্য ভ্রমনের আমাদের সর্বশেষ গন্তব্য কোয়াম্বাটরে। তবে যাওয়ার পথের বৈচিত্র্য যেমন তার প্রকৃতিতে ছিল,তেমন ছিল গন্তব্যে পৌঁছানোর যানবাহনে ও ধরনেও বটে। কি রকম ??? অনেক ধারার রকমবেরকম না হলেও দুরকমের যানবাহনের গল্প আছে এর সাথে জড়িয়ে ধরে। কথা ছিল জয়সন আমাদের পোঁটলা পুঁটলি সহ নিয়ে প্রথমে যাবে উটি রেল স্টেশন। সেখানে আমাদের নামিয়ে ; শুধুমাত্র লটবহর সহ সে চলে যাবে কুন্নুর রেল স্টেশন। তবে আমরা কি করব ??? সেখানেই তো আসল চমক আর গল্পে ২নম্বর যানবাহনের  প্রবেশ.... । উটি থেকে মেট্টুপলয়মের নীলগিরি জয় রাইড। যদিও এই ট্রেন এক ঘন্টা পনেরো মিনিটের ১৯ কিলোমিটার পথ প্রকৃতির মন ভোলানো রূপ দেখাতে দেখাতে কুন্নুর পৌঁছে দেয়। টিকিট আগেই কাটা হয়েছিল সেই অনলাইনে। সে লাইনের ডিজিটাল ভিড় ভারি কম ছিল না, প্রথম শ্রেণীর টিকিট মেলেনি, আমরা ২য় শ্রেনীর টিকিট নিয়ে  জয়সনকে আপাতত বাই যাই করে প্রথমেই উটি স্টেশনের ক্যান্টিনে পেট পূজোতে যোগ দিতে হাজির হলাম। আবার কষ্ট করে ইডলি, ধোসা খেতে গিয়ে পুরি পেয়ে আহ্লাদে আটের বদল ষোলখান হলেও নিজের রসনাকে কন্ট্রোল করলাম অনেক কষ্টে,কারণ পথ তখন অনেক বাকি... গোল পেকে তা পেটের দিকে হাঁটা দিলে আমার পক্ষে ছোটা মুশকিল হবে । কুন্নুরে পৌঁছে ওদিকের কিছু ঘোরাঘুরি সেরে পরের লক্ষ্যে পৌঁছানোর কথা আমাদের... সন্ধ্যা হবে হয়তো বা।আমি অনেক দিন পর প্লেন ধোসা পেয়ে খোশ মেজাজে তা উদরস্থ করলাম। যদিও আমরা দক্ষিণে হাজির হয়েছি কিন্তু এ যাবৎ নরম নরম ধোসা নাকি গোলা রুটি সহ আরো কিছু না কিছু খেয়ে পেট ভরাচ্ছিলাম। পেটে খাবার পুরে এক স্মরনীয় অভিজ্ঞতা জড়ো করতে আমরা উটি রেল স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে ঢুকে এক মডেল ট্রেনের সামনে ছবি তুলতে রেলওয়ে ট্র্যাক পেরিয়ে ওপারে ক্ষণিকের অতিথি হতে হাজির হলাম। এই বুঝি টয় ট্রেন এলো এলো চিন্তায় চিন্তায় ফের জলদি জলদি ঠিক দিকে ফিরে গেলাম। ট্রেন হাজির হলো আমরা টিম ১১ দুই অসম ভাগে ভাগ হয়ে দুই বগিতে টিকিট অনুযায়ী উঠে পড়লাম। এক বগিতে সবার টিকিটের টিকি বাঁধা যায়নি,আগেই লিখেছিলাম regarding ডিজিটাল ভিড় !!!! ট্রেন ছেড়ে দিল। তারপরে এক অনবদ্য প্রকৃতির সবুজ নগরের দুয়ার খুলে গেল আমাদের চোখের সন্মুখে। ছবির মতন প্রকৃতিকে দেখতে দেখতে ছবি তুলতে তুলতে চললাম। এক ট্রাভেল ব্লগারের কথায় জেনেছিলাম যে এই ট্রেন নাকি এতো ধীরে ধীরে চলে যে নেমে পড়ে, ছবি তুলে আবার ফিরে এসে ট্রেনে উঠে পড়া যায়!!!! কিন্তু সে গুড়ে বালি চাক্ষুষ করলাম। ওমন চলচ্চিত্রের চিত্রনাট্যে সম্ভব হতে পারে,এখানে একদমই অসম্ভব !!! পাহাড়ি পথের বাঁকে একেবেঁকে ট্রেনের চলমানতাকে ট্রেনের জানালা দিয়ে হাত বাড়িয়ে ক্যামেরাতে ধরে ফেললাম আর সকলের মতন। তবে এই টয় ট্রেনের রুফ টপের সেই ছাইয়া ছাইয়া নৃত্যের কথা কে না জানে??? প্রায় প্রায় অনেকেই সে গানের গুঁতোয় পাগল হয়েছিল।আমার নজর ছিল আরো একটু পিছিয়ে রাজেশ খান্না শর্মিলার টয় ট্রেনের গানে,আসলে ওই ট্রেন রাজ্যতুতো বলেই হয়তো 😃। তবে রাজ্যতুতো টয় ট্রেনে আসীন হ‌ওয়ার সুযোগ এখনও ঘটেনি। এখানে ট্রেনের দুই পাশের সবুজ প্রকৃতির মধ্যে মধ্যে ছোট্ট কিছু স্টেশনের মধ্যবর্তী একখান নজর কাড়ল তার নাম দেখিয়ে... স্টেশনের নাম লাভডেল... মানে যাইহোক লাভ শব্দ খান দেখেই আমি খানিক ডগোমগো হয়ে গেলাম বটে !!!!! মনে হল এই যে নাম দেখে যারপরনাই খুশি হয়ে পড়লাম, তাতে কোন লোকসান তো  নেই।সেই স্টেশনের একখান ছবিও তুলে ফেললাম।এক সময় স্মরনীয় এই টয়ট্রেন জার্নি শেষ হল,আমরা পৌঁছলাম কুন্নুর স্টেশনে। ছবির মতন স্টেশন পেরিয়ে ছবি তোলার পর্ব মিটিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। স্টেশনের বাইরেই জয়সন অপেক্ষা করছিল টেম্পো ট্রাভেলার নিয়ে। এরপরে ছিল কুন্নুরের কিছু কিছু প্রধান প্রধান দর্শনীয় স্থান ঘুরে কোয়েম্বাটোর পৌঁছানো। কুন্নুরে দেখার জন্য দর্শনীয় স্থান কয়খান তার সাকিন ঠিকানা আমার কর্তা মশাই মুখস্থ করেছিল গেল বার কলেজতুত বন্ধুদের সাথে ওদিকে গিয়ে। এবারে আবার রিভাইজ করে নিয়ে বেছে রেখেছিল। সেবারেও থাকেনি, কাজে কাজেই যা দেখব তা নাকি সব,এমন ভাবনায় তা দিতে দিতেই পথ চলা শুরু করলাম আমরা। আমরা যা করি, যা দেখি, যা খাই infact  যা যা করি তা হল সেরা... এটা একদমই আমাদের বিবাহ  পরবর্তী ঠিকানার খানদানি ব্যপার আর কিং খান এর গানের স্টাইলে I am the best ঘরানারও বটে।সেই ভাবনা থুড়ি লিস্ট মিলিয়ে পার্ক ও চা বাগানে বিস্তারিত ছবি তোলার পর দেখা গেল একখান পয়েন্ট বন্ধ আর আরেকজন ঢের না হলেও বেশ দূরে,আর পথে বাসের ভিড় বেশ বেশি।তাহলে আর কি??? অগত্যা বাস ঘুরিয়ে নেওয়ার আগে এক জায়গায় কয়জন নেমে একটু মেঘ পাহাড়ের ঘেরাটোপে ছবি ও প্রকৃতিকে দেখে,মন ভরে, ফের বাসে নিজেদের ভরে নিয়ে চললাম নতুন গন্তব্যে।পথে কোথাও খেয়ে নিতে হবে। বেলার জানান পেট মারফত পেতে পেতে ব্যাগপত্র থেকে খুচরো আর শুকনো খাবার বেরিয়ে পড়ল।কারণ পথ জোড়া গাড়ির মেলাতে আমরা ততক্ষণে আটক হয়ে পড়েছি। ছানাদের কয়জন খিদে চেপে ধরার আগেই ঘুমের চাপে অস্থির হয়ে ঘুমিয়ে তখন কাদা। এদিকে এ ধারের নামন দাদা,নামতে না পেরে ভয়ানক অস্থির চিত্ত নিয়ে কোনকিছুতেই দৃটপাত করার অবস্থায় ছিলেন না। এক ধারে গাড়ি সারি সারি অন্য ধারের পথ খাদের দিকে দিয়েছে পাড়ি... খাদের দিকে না তাকালে প্রকৃতির মায়া ভরা রূপ.... তবে ???খাদে কেন তাকাবো?গুরুজন,গুণীজন সক্কলে বলেছেন যে নজর উঁচু দিকে রাখবে,আমার মা ও এই এক কথাই প‌ই প‌ই  করে বলে গিয়েছেন। আর আমি বরাবরের বাধ্য কিনা !!! কাজেই খাদের পানে তাকিয়ে ভয়কে বরণ করার মানেই নেই।সব রাতের শেষ আছে।ওমন জড়ো হ‌ওয়া যানবাহন সরো বলতেই না সরলেও এক সময় তো কালের নিয়মে সরবেই আর সরলোও,আমরাও পথে এগিয়ে চললাম খাবারের দোকান দেখতে দেখতে।খিদে তখন আর খাদে নেই,ছাদে I mean উচ্চগ্রামে বাঁধা পড়েছে।সাথের ব্যাগজাত বিস্কুট শেষ করে, বাঁকা চোখে দেখা বাতাসাতে ওবধি হাত পড়ে গেছে... খিদে এমন বালাই।যানবাহনের জটলার জন্য এক খাবারের দোকান আগে দেখেও নামতে সক্ষম হ‌ইনি।এ যেন পুরো হাতের লক্ষ্মী পায়ে ঠেলার সদৃশ ঘটনা। ফলত আর ওমন খাবার দোকানের দেখাই মিলল না।যতবার জয়সনকে জিজ্ঞেস করি,খানা মিলেগা? সে খালি বলে... থোড়া অউর ম্যাম। থোড়া থোড়া করে দেখি পেটের মাঝে খিদেতে বড়া বড়া (বড়ো বড়ো) গ্যাপ তৈরি হয়ে গেছে। হেনকালে এক চা আর স্ন্যাকস বারের বোর্ড দেখে আমার কর্তা মশাই হ্যাচোর পাচড় করে সেখানে নেমে অল্প সল্প খ্যাটনের বন্দোবস্ত করলেন.... গরম গরম হনি লেমন টি আর গরম ধোঁয়া ওঠা ম্যাগী। খিদে তখন আর অপসন দান করার সুযোগ দেয়নি। আমরা একদম হাপুস হুপুস করে গরম ম্যাগী খেয়ে পেট ভরালাম। ঘুরতে বেরিয়ে তো আর ঘরের নিয়ম বলবত্ রাখা যায় না,তখন ঘোরাঘুরিকে এক নম্বরে রেখে বাকিদের নম্বরের অদল বদল করে নিতেই হয়।তবেই না এক পরিপূর্ণ ঘোরার গল্প জমে ওঠে !!! বেড়াতে গিয়ে একাধিক বার দুপুরের নামে যে খাবার বরাদ্দ তার দেখা মিলেছে বিকেলে,এবারে দুপুরের খাবারের মেনু,জলখাবারের মেনুতে মিশে গেনু হয়ে পেট ভরিয়ে নিল বিকেলে।বিকেলের চা তাতে যোগ করে আমরা দুপুর আর বিকেলের খাবারের ভাবনাকে মিলিয়ে নিয়ে আবার যাত্রা শুরু করলাম। আবার পথ চলা শুরু করার কিছু পরেই দলের দুই মেম্বারের পেট উঠল গুলিয়ে,তারা সব রকম ওষুধের প্রভাব ব্যর্থ করে একটু আগের খাবার পথে দান করে শান্তি পেল,শান্ত হল।পাহাড়ি পথের এই শরীর জনিত পাক খুব কষ্টকর।এর আরো খানিক পরে আমরা সত্যিই পাহাড় ছাড়া হয়ে সমতলে হাজির হলাম।তবে কুন্নুরের পাহাড়ি পথের বাঁকে বাঁকে থাকে থাকে সাজানো চা বাগানের শোভা মনের ক্যানভাসে পার্মানেন্ট হয়ে রয়ে গেল.... পাহাড়ি জনপদের বাড়ির সামনের এক ফালি ঢালু জমিতে চাষ করা চা গাছ,আমাদের বিস্মিত করেছে বারবার.... এমন‌ও যে হয়,জানতাম না। উত্তরবঙ্গের পাহাড়ি জনপদে, পদে পদে ক্ষুদ্রতম স্থানে ফুলের মেলা দেখেছি, যদিও ওদিকের চায়ের জগত জোড়া সন্মান। ফুল এদিকেও দেখেছি , কিন্তু নিজের অধিকৃত ছোট্ট বাগান জোড়া চা গাছ !!!! নৈব নৈব চ।জগত সংসার মনে করিয়ে দেয়,যে কত কম জানি আমরা... ।

সমতলে হাজির হলাম সন্ধ্যা নামার পথে , এরপরে সন্ধ্যা গড়িয়ে গেল রাতে,আর হা ক্লান্ত আমরা রাত প্রায় ৮টার কাছে পৌঁছে গেলাম, আমাদের কোয়াম্বাটরের হোটেলে, যা একদম শহরের মধ্যস্থলে অবস্থিত। চারপাশে ছড়ানো মার্কেট প্লেস। ঝকঝকে চকচকে দোকানের মাঝের চ‌ওড়া প্রসস্থ পথের পাশেই ছিল তামিলনাড়ু ট্যুরিজমের আমাদের হোটেল। আসার পথের চালচিত্র আমাদের বার বার কলকাতার পথ ঘাট মনে করাচ্ছিল। হয়তো আকারগত সাদৃশ্য তার কারণ , আবার এমনও হতে পারে দীর্ঘ এক সপ্তাহ নিজ শহর থেকে দূরে অবস্থান হয়তো বা এর কারণ ... কি জানি ??? 

Comments

Popular posts from this blog

আক্কেল সেলামি

বেড়াতে গিয়ে মজারু ৬০

বেড়াতে গিয়ে মজারু ৬৭