বেড়াতে গিয়ে মজারু ৬৪

 বেড়াতে গিয়ে মজারু ৬৪

পরের দিন আমাদের বেরিয়ে পড়ার কথা বেশ সকাল সকাল ... কারণ সেদিন দশমী অর্থাৎ দশেরা। এই দশেরাতে অনেক পথ বন্ধ করে দেওয়া হয় সকাল থেকে। কারণ সেই ভীমা র নেতৃত্বে বেরিয়ে পরে সাজুগুজু করা হস্তি ও মানুষের নগর জোড়া পরিক্রমা। আমাদের এক বাহন চালক রঘু জী আমাদের যতোটা আতঙ্কিত করে সকাল ৭টা র সময়সীমা দিয়েছিলেন , আমরা তার অজানিতে অপর গাড়ির চালকের সাথের কথোপকথন  থেকে রঘুজী র গল্পে কতটা দুধ আর কতটা জল পষ্ট বুঝে নিয়ে মাইশূরু ঘুরু শেষ করার অর্থাৎ মাইশুরুকে যাই বা বাই করার সময় ঠিক করে নিলাম, নিজেদের আর রঘু জী র দেওয়া সময়ের মাঝ বরাবর। এদিকে সেদিন এক সখি র হাসি মুখ দেখতে না দেখতেই আরেক সখির শরীর খারাপের পো ধরা বিরস বদন দেখার শুভ (?) সূচনা হয়ে গেল জলখাবার টেবিলেই। এক যাত্রায় ভিন্ন ফল কি কখনো কাম্য ??? মোটেও না !!!

মাঝের একদিন ডিউটি শেষ করতে‌ কিঞ্চিত দেরির জন্য ঘরে বিস্তারিত বকুনি খেয়ে পরের দিন home front কে ঠাণ্ডা করতে রঘু জি ছুটি করেছিল। আমরা রঘু জী কে ছাড়া অন্য বাহন চালকের সাথে ছুটে ছুটে ঘোরাঘুরি করেছিলাম মাইশোর। সেদিন ছিল আমাদের মাইশুরু র ঘুরু । বকুনির কথা জানতে পারি , কুর্গ যাওয়ার দিন গাড়িতে রঘু জী র ফোনের স্পিকার on থাকার জন্য। বকুনির ভাষা যা ই হোক , তার উপস্থাপনাতে তা যে নেহাৎ ই বকাঝকা সুলভ কথা , তাতে সন্দেহের কোন অবকাশ ছিল না। কাজে কাজেই গৃহ শান্তি ফিরিয়ে পরের দিন আমাদের উটি নিয়ে যাওয়ার জন্য তরতাজা রঘু জী হাজির হল সময় মতো। আগের দিন দেবাশ্রিতার কেনা মাইশোর সিল্কের প্যাকেট ভুল বশতঃ গাড়ি তে রয়ে গিয়ে , এক চিন্তা র বাতাবরণ তৈরি করেছিল , গাড়ি শাড়ি সহ আমাদের কাছে হাজির হতেই আমরা শাড়ির প্যাকেট দেখে নিয়ে , গুনে গেঁথে বাকি সব লটবহর ভাগ যোগ করে দুই গাড়িতে তুলে দিয়ে মাইশুরু কে বাই করে , শহর পিছনে ফেলে উটির দিকের পথে এগিয়ে পড়লাম।

আমাদের শহরের কলকারখানাতে স্বর্গের সেরা কারিগর বিশ্বকর্মার আরাধনা করা হয় দূগ্গা মায়ের আগমনের অল্প আগেই। মাইশুরুতে যানবাহনের পূজো বলো আরাধনা বলো , তা হয় দশেরার দিনে । র‌ওনা দিয়েই চাক্ষুষ করলাম আমাদের দুই বাহনের সামনে আটকানো পূজোর নানান উপচার । সিঁদুর মাখানো সেই উপচার গাড়ির সামনে বাঁধনে বন্দী। সব উপচার মনে নেই, তবে আঁখ অথবা ভুট্টা জাতীয় কিছু  ছিল তার ডালপালা সহ। যার কিয়দংশ ছাগল আর বাঁদরে খেয়ে গেল বান্দীপুর ফরেস্ট ঢোকার কিছু আগের সিগনালে যখন আমাদের বাহন অপেক্ষায় ছিল। শহর থেকে বেরিয়ে পড়তে আমাদের তেমন অসুবিধা কিছু হয়নি। পথঘাট আটক করে তখনো কোন শোভাযাত্রা শুরু হয়নি।

উটির পথে আমাদের পেরিয়ে যেতে হবে দুইখান জঙ্গল। যার একখান কর্ণাটক রাজ্যের বান্দীপুর ফরেস্ট ও অন্যখান তামিলনাড়ু রাজ্যের মধুমালাই ফরেস্ট। মধুমালাই জঙ্গলে মালাই পাওয়া যায় কিনা জানিনা, তবে মেলাই জীব জন্তুর বাস । ওই দুই জঙ্গলে বাঘ , হাতি , হরিণ , ময়ূরসহ অসংখ্য জীব জন্তুর আবাস। তবে আবাসিক দের মধ্যে অগুন্তি হরিণ , খান দুয়েক ময়ূর ও খান দুয়েক হাতির দর্শন মিলল। বাকি যারা আছে , তারা ওতো চটপট ধরা দেওয়ার বান্দা নয়কো। এই দুই জঙ্গলে সাফারিও হয়। আমরা জঙ্গলের বুক চেরা মসৃণ পথ ধরে চলেছিলাম। তবে ঝড় উড়িয়ে নয়কো। থেমে থেমে গুটি গুটি চলেছিলাম উটি। কারণ গাড়ির ঢল যে সেদিন উটি মুখী।ওমন মধু মাখা নাম হলে কি হবে , একদা এখানে ই চন্দন দস্যু বীরাপ্পনের ডেরা ছিল । তখন এই জঙ্গল পথ পাড়ি দেওয়া ছিল এক ত্রাস !!! রাতে যারা এই জঙ্গুলে পথ অতিক্রম করতেন , সাথে পাহারাদার থাকত অতি অবশ্যই । আর আরো অদ্ভুত কথা এই যে ওমন বিপদ সংকুল, দস্যু র দস্যিপনা করার জঙ্গল  আঁধার ঘেরা রাতে , পেরিয়ে উটি যাত্রা করেছিল আমার কর্তা মশাই। সাথে খান কতক বন্ধু। যারা আবার তখন সদ্য গোঁফ গজানো কলেজ পড়ুয়া। আর আমরা দস্যু মুক্ত জঙ্গল পার হলাম ঝকঝকে তকতকে রোদে রাঙা দিনে। স্কুলে বলো কলেজে বলো .... পড়াশোনা র ময়দানে তুলনামূলক আলোচনা খুব পছন্দের বিষয়। সে ধারা মেনে ফেসবুক ওবধি now & then বিভাগ খুলে ফেলেছে । আমিও কতকটা তেমন তুলনায় নেমে লিখে ফেললাম এ সব । তবে রাতে গাড়ি নাকি কোন অনুরোধেও থামবে না , জানিয়ে দে ছুট দিয়ে গন্তব্যে পৌঁছাত তখন। আর দিনমানে আমরা থামতে থামতে গুটি গুটি করে গাড়ি তে আসীন হয়ে উটি পৌঁছে গেলাম তিনের বদলে তার ডবল অর্থাৎ ছয় ঘণ্টা র কাছাকাছি সময় ব্যয় করে। উটিতে আমরা উঠেছিলাম তামিলনাড়ু ট্যুরিজমের হোটেলে। যথারীতি সরকারি এই property শহরের খুব prime location এ অবস্থিত ছিল। এখানেও আমাদের সবার ঘরের অবস্থান ছিল পাশাপাশি। উটিতে নেমে আমাদের লটবহর নিয়ে ঘরে ঢোকার আগে ও পরে পষ্ট বুঝলাম যে উটিতে ঠাণ্ডা হ্যায় !!! যদিও সয়ে গেলে তা যে আর মন্দ লাগবে না তাতে সন্দ ( সন্দেহ) বা ধন্দ কোনটা ই ছিল না। কিন্তু আমাদের দুই গাড়ির অপর গাড়ির থেকে দুই সখীর একজন যখন মুখ কাচুমাচু করে এসে আমার সাথে ভাব ভালোবাসা করলেন , বুঝলাম এ বেটী র নির্ঘাত শরীরের অন্দরমহলে হৈহৈ হল্লা শুরু হয়েছে .... দুই সখীর শরীর খারাপের বহিঃ প্রকাশ বিপরীত মুখী .... যা দেখা গেল  !!! আমার ভাবনা বলো কষ্ট কল্পনা .... যাই বলো না কেন তা যে একশো র জায়গায় দুশো শতাংশ সঠিক তা জানালো দেবাশ্রিতা । কন্যার motion sickness ফের হাজিরা দিয়ে নাড়িয়ে দিয়েছে এক্কেরে !!! 

ঘরে ঢোকার আগেই সকলে খাবারের অর্ডার দিলাম, কারণ আগেভাগেই হোটেল কর্তৃপক্ষ আমাদের একটা cutoff time জানিয়ে বলেছিলেন যে , ওই সময় পেরিয়ে গেলে মিলবে হরিমটর,🤭😝 কিছু পরেই আপাত সংসার সাজিয়ে আমরা হোটলের টপ ফ্লোরের ডাইনিং হলে টক গন্ধ শুঁকতে শুঁকতে হাজির হলাম এবং হরিমটর ভাল নাকি দক্ষিণ ভারতীয় খাবার ভাল সে সব বিচার শিকেয় তুলে আমাদের বঙ্গ থেকে সঙ্গ ( লাগেজে ) নেওয়া ঘি / মাখন আর আলুভাজা র সদ্ব্যবহার করা শুরু করলাম সাদা ভাত সহোযোগে ... ঘরের টক টক গন্ধ মাইনাস করলে , খিদের মুখে তা যেন ছিল অমৃত সমান। সুকুমার রায় তাঁর  ছড়াতে লিখেছিলেন .... "আকাশের গায়ে নাকি টক টক গন্ধ। টক টক থাকে নাকো হলে পরে বৃষ্টি , তখন দেখছি চেটে , একেবারে মিষ্টি " ..... কবির  এমন রচনা র অনুপ্রেরণা কি তবে এই টক টক স্বাদের দক্ষিণী খাবার !!! কে জানে  ???? 

খাবার পেটে পুরে , আমাদের পরবর্তী গন্তব্য ছিল উটি লেক । এখানে বলার মতন দুখান বিষয় রেডি হয়ে ছিল। বলেই ফেলি কেমন !!! কন্যার জন্য সর্ব রকম ছোট বড়ো ফুল , হাপ গরম জামা,  মায় হুডি , টুপি , স্কার্ফ আনলেও নিজের একখান শাল ছাড়া আর কিছু আনতে বেমালুম ভুলে মেরেছি । এদিকে তাল কানার মতন সব ব্যাগ পত্তর খুঁজে বেবাক হতাশ হলেও তখন‌ ই করার কিছুই নেই। তিনি কি আর এ হেন সুযোগ ছাড়েন ???? খান কতক মিষ্টি মিষ্টি কড়াপাক পরিবেশন করে একদম বলিউডী নায়কোচিত আচরণে জ্যাকেট দান করলেন । বাকি সকলেই ঠাণ্ডায় কম বেশি কাবু হলেও রামু দা আর এদিকের দাদাভাই ( আমার পতিদেব) গরম পোশাক কে ফুৎকারে উড়িয়ে সাজ গোজ করে বেরিয়ে পড়লেন । আর ২য় বিষয় খান হল গিয়ে .... দুই সখী র আরেক সখী পথে দানধ্যানে র ( motion sickness ) পর এবার ভাল্লাগেনা র ঘ্যান ঘ্যান শুরু করলেন। আমার মেজাজের পারা বাড়তে লাগলো আর ঠাণ্ডা লাগা কমতে লাগল । এমনিতে গায়ের জ্যাকেট তো ছিলোই। উটিতে আমাদের পৌঁছে দিয়ে সব হিসাব বরাবর করে রঘুবাহিনী বাই বাই করে যাই হয়ে গিয়েছেন তখন বেশ খানেকক্ষণ আগে। আমাদের পরবর্তী ঘোরাঘুরি করানো র দায়িত্বের ভার নিয়েছেন বাহন চালক জয়সন । এবারের যাত্রাতে ভিন্ন মাত্রা যুক্ত করতে হাজির হলো ১৩ আসন বিশিষ্ট ট্যম্পো ট্রাভেলার । অর্থাৎ আর দূরে দূরে নয় সবাই কাছে কাছে হয়ে ঘুরব ... চেনা অচেনা র ভেদ বিগত দিনে হাল্কা  হতে হতে মিলিয়ে গেছে তখন । সবাই রেডি স্টেডি হলেও আমাদের পুপে দেবী তখন আনস্টেডি ‌‌, তবে এক যাত্রায় পৃথক ফল ঘটানোর মতন‌ও হাল নয় কাজেই আমরা চালু হলাম কখনো ঢালু  তো কখনো মনের মতন পথ বেয়ে । বেশ খানিকক্ষণ পাহাড়ি পথে চলতে চলতে এসে পড়লাম উটি লেকের সামনে । উফ্ !!!! সেখানেও গুচ্ছ গুচ্ছ লোক , ঘোড়া , গাড়ি মিলেজুলে একখান একাকার অবস্থা তৈরি হয়েছে দেখলাম। গাড়ি থেকে নেমে সব বাঁচিয়ে লেকের কাছাকাছি এসে লাইনের আইনে জুড়ে দাঁড়ানোর পরে বুঝলাম এখনো আরেক লাইনের আইনে বন্দী হতে হবে .... আসলে ১ম লাইন ছিল লেক সংলগ্ন অঞ্চলে প্রবেশের জন্য, পরের লাইন ..... দিল দিওয়ানা গান গেয়ে বা না গেয়ে বা ভেবে উটি লেকের বোটে গিয়ে উঠি , করার টিকিটের লাইন !!!! ওতো ভিড়ে দিলের হাল তখন বেশ সঙ্গীন !!! এদিকে আমার দিল যার তরে দিওয়ানা, সে তখন দল সামলাতে গিয়ে পুরো ঘ্যাঁক করে কামড়ে দেওয়ার আগের স্টেজে। আসলে হয়েছে কি জানো ??? টিকিট কাটার পরে নাকি ঘন্টা খানেকের অপেক্ষায় তা দিতে হবে .... এমন জেনে আমরা ছড়িয়ে ছিটিয়ে গিয়েছিলাম ছবি , পোস ও দোকানে কেনাকাটার মাঝে । এদিকে কিঞ্চিত আগেভাগে মোটর বোট হাজির হতে গুনে গেঁথে বোটে তুলতে গিয়ে বৌ আর শালীকে হারিয়ে ফেলে আমার তেনার তখন রাগ গনগনিয়ে উঠেছে। বিয়ের ২১ বছর ছুঁই ছুঁই পুরাতন বৌকে খুঁজে পেলে কোন জন আর রাগ সামলাতে পারে ??? এই যদি ২১ বছর আগের গল্প হোতো .... ছবিটা কেমন সুন্দর আর রোমান্টিকতা মাখোমাখো হতো নয় কি ???? যাক আমিও কি আর ২১বছর আগের শান্ত মতন নববধূটি আছি ??? আমিও খানিক সমান তালে তাল মিলিয়ে দিতেই শান্তশ্রী দি চটজলদি মধ্যস্থতায় শান্তি ফিরিয়ে আনল । তারপর ??? তার আর পর নেই, নেই কোন ঠিকানা .... উটির বোটে উঠে একদম মুণ্ডি ঠাণ্ডি হয়ে বেশ মাখোমাখো হয়েই গেল দুজনের মন .... কণকণে ঠাণ্ডা হাওয়া গায়ে মেখে, ফুরফুরে মেজাজে বোট রাইড শেষ করে আমরা পাড়ে উঠে টুকটাক দোকান ঘুরে , ছবি তুলে বাইরে চলে এলাম। তৎক্ষণাৎ ঠিক হলো আমরা রাতের খাবার খেয়ে হোটেলে ফিরব , যাতে হোটেলের দক্ষিণ দেশীয় টক টক গন্ধযুক্ত খাবার থেকে আমরা মুক্তি পাই সেই রাতের মতন । সবাই এক বাক্যে রাজি হয়ে বাসের দিকে পা বাড়ালাম। 

এরপর আমাদের হোটেলের কাছাকাছি এক জনবহুল এলাকায় ভয়ানক রকম ভিড় ঠেলে তেঁতুল পাতায় নয়জন স্টাইলে হরেক রকম ননভেজ খেয়ে মন ও পেটু ভর ভরন্ত করে হোটেল ফেরার পথ ধরলাম। দ্বিতীয় সখীর ঘ্যানঘ্যানানি তখন লাগাম ছাড়া হবে হবে করছিল , তাই পিতা তার পুত্রী, ও বাকি দুই গেঁড়িকে নিয়ে অটো চড়ে হোটেল মুখী হতে আমরা বাকিরা ১১নম্বর সচল করে হোটেল মুখী হলাম। পথে একখান দোকানে কিছু খরিদারি করে পাহাড়ি পথে হাঁপাতে হাঁপাতে ঘরে ফিরলাম। বাদ বাকি ছানা পোনা সব নিজ নিজ ঘরে প্রস্থান করলেও, শরীরে গতিকের গোলোযোগ পুপেকে মায়ের কাছে থাকতে বাধ্য করল .... ফোনের টান তখন আর পিকে নেই , তা তখন বেশ ফিকে , তবে টিকে অবশ্যই আছে। পরিস্থিতি মতন সে আবার পিক সিজনে ঘাঁটি গাড়বে। অগত্যা অন্বেষা সেদিন রাতে থাকল নিজের মতন একাকী। পুপে কচি বেলার মতন মায়ের কোল ঘেঁষে শুয়ে ঘুমের দেশে পৌঁছে গেল । আমিও সারাদিনের ক্লান্তিতে নিমেষে নরম গদি আর ঘুমে ডুবে গেলাম। ক্লান্ত শরীর তখন গদি র নরমে তার ভিতরে ঢুকে যাওয়া অস্বস্তিকর অবস্থার কথা ভুলে ঘুমে ঢলে পড়েছে। পরেরদিন আমাদের উটি র আরো অন্যান্য ঘোরাঘুরি করার কথা ... সে ভাবনা আবার হলুদ বসন্তের ভাবনায় আগে থেকেই ভাবিত !!!!!


Comments

Popular posts from this blog

আক্কেল সেলামি

বেড়াতে গিয়ে মজারু ৬০

বেড়াতে গিয়ে মজারু ৬৭