বেড়াতে গিয়ে মজারু ৬৫

 বেড়াতে গিয়ে মজারু ৬৫ 

                    উটিতে এক কণকণে ভোর উঁকি দিল । ঘুম ভাঙ্গলো। ঘুমের আমেজ ঘরে বিরাজমান তখনো। ভোরের ঘুম জাগরণের এই সন্ধিক্ষণ টা আমার মতন অনেকেরই ভারি প্রিয় , বিশেষ করে শীতের ভোরে লেপের ওম মেখে আরো খানিক গড়াগড়ি , আমার কর্তা মশাই বলেন ... মৌজ করছে !!! উটিতে ওমন এক ভোর হাজির, নিজের শহরে মৌজ / মোজ করার সময় কোথায় ? সাত সতেরো ঘুরপাক সে ঘরে র ভিতরে হোক কি বাইরে হোক ... শুরু হয়ে যায় আর মৌজ মুখ গোজ করে কাজে যোগ দেয়। এখানে তাড়া থাকলেও তা কাজের না , সময়ে ঘোরাঘুরি করতে বেরনোর তাড়া।

এক সময় ঘুম কে ভাগিয়ে সবাই কে জাগিয়ে আমার কন্যা চালু হল ‌সেদিন ঘরে শুয়ে থাকার দাবি নিয়ে !!! হরে কৃষ্ণ !!!! ঘুম ভেগে তো গেলোই সাথে আমি ভয়ানক রেগেও গেলাম। পুপেকে দেখে একদমই খুব কাহিল মনে হচ্ছিল না ... পথের ক্লান্তি ঘুমের পর থাকার কথা নয় আর motion sickness এর পর্ব পেরিয়ে গেছে বেশ একদিনের কাছাকাছি সময়ে । তাহলে ??? আসলে ফোনে ফোনে বেশ খান তিনেক রাতের বেশি টা কাবার করে তখন পুপে দেবীর শরীর জোড়া ঘুম আর ক্লান্তির ঢল নেমেছে। অন্বেষা মাসির সাথে শুয়ে তো মাসির সাথে গল্পে রাত কাটেনি, যেমন হতো আমাদের কালে ... বিয়ে বা কোন অনুষ্ঠান বাড়িতে একখাটে দিদি , বোনেরা মিলে ঘুমাতে গেলে ঘুম কম কিন্তুক গপ্পো থাকত ভরপুর আর সে সব গপ্পো হোতো কান ফিসফিস হাহা হিহি তে ভরা । ঘুম কম হলেও মোবাইলের কু প্রভাবের মতন তা শরীর ভরে ক্লান্তি দান করতো না ... একটু বেলা করে উঠে আবার সবাই মেতে উঠতাম বাদবাকি অনুষ্ঠানে। কিন্তু এখানে পরিস্থিতি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন ... রাতে ঘুম ছিল অবশ্য প্রয়োজনীয় .... কারণ মাইশুরু তে আসার আগের দিন মধ্যরাত থেকেই ঘুমের ঘাটতি শুরু হয়েছিল সবার। যেটা আমরা পরের রাত গুলো তে মেকাপ করলেও , পুপে কথা না শুনে ফোনবিলাশী হয়েছিল। এদিকে সকালে রোজ আমরা গতিতে ঘুরছি ভিন্ন ভিন্ন ঠিকানা তে .... 

খানিক অভয় দান , ভয় বিতরণে যখন কাজ দিল না  নির্দেশ জারি করে পুপেকে সাথে নিয়েই উটি ঘুরতে বেরিয়ে পড়লাম দক্ষিণ দেশীয় ব্রেকফাস্ট খাবার ঠিক পরেই। পড়াতে বসার ভয় যখন কাজে দিল না জোর খাটিয়ে ঘেঁটি ধরতেই হল। সকলে ই আমার সাথ্ দিল। তা না হলে বাবা আর মেয়ে ঘরেই থাকার তোড়জোড় করছিল। আর উটি ঘুরতে তুমি আর আমি সহ অনেকে গিয়েছি বটে , কিন্তু তুমি বাদে কি উটি দেখা সাজে ????? কভি নেহি !!!! প্রথমেই জয়সনের টেম্পো তে উঠে সীটে টেম্পোরারি বসে চললাম পাইকারা লেক দেখতে আর ছবি যে পাইকারি রেটে তুলতেই থাকব সকলে , সে আর বলতে ???? চলন্ত বাসে এক প্রস্থ থোড়ি ফুরসত বের করে নিয়ে আজ কি রাত 🎶🎶 গানের সাথে নৃত্য পরিবেশিত হলো ‌... দর্শকদের মুখে তখন হাজার বাতির আলো আর হ্যাপিডেন্টের ঝিলিক মারা হাসি ছড়িয়ে পড়েছে। 

সকাল সকাল লেকের ধারে ফাঁকায় ফাঁকায় প্রকৃতির মন মাতাল করা রূপ দেখতে দেখতে কণকণে ঠাণ্ডা হাওয়া লাগিয়ে লেকের জলে বোট রাইড করতে আমরা বোটে উঠে পড়লাম। অসম্ভব সুন্দর। যেমন আকাশ, তেমন চরাচর ব্যাপী রঙিন ঝকঝকে প্রকৃতি। কোথায় নীল আকাশের প্রতিবিম্ব পড়ে লেকের গাঢ় নীল জল , কোথায় বা সেই জলের স্রোতে র ওপরে সূর্য কিরণের ঝিকিমিকি, দূরে সবুজ পাহাড়ের ইতিউতি উপস্থিতি ... স্বর্গ কি এমন সুন্দর নাকি আমাদের দেশ সত্যিই স্বর্গাদপী গরিয়সী !!!!! বোট রাইড একসময় শেষ হলো , আমরা পরের গন্তব্য পাইকারা জলপ্রপাতের দিকে এগিয়ে চললাম টেম্পো ট্রাভেলারে চড়ে । একটা পয়েন্টে আমাদের নামিয়ে দিয়ে পথ নির্দেশ ও ফেরার পথের হদিস দিয়ে জয়সন হুস করে হারিয়ে যাওয়া র আগেই আমরা তার দেখানো পথের দিশা ধরে এগিয়ে আরেক পথে উঠে এলাম। যে পথ আগের পথের সমান্তরাল। আমরা সকলে একত্রিত হয়ে ব্যাটারি চালিত গাড়ির জন্য খাড়া হলাম , পথ কতটা বুঝতে  নাচার , হয়তো অল্প, গল্প করে পেরিয়ে যাওয়া যেত ঠিক ই , কিন্তু .... দেখাই যাক না !!! ভেবে উঠতে না উঠতেই নেমে পড়তে হলো । এবারে প্রকৃতির মাঝ বরাবর নামতে নামতে অনেক খানি হাঁটি হাঁটি করতে করতে , ছবি তুলতে তুলতে অনেক নিচে নেমে এলাম পাহাড়ি স্রোতের জলধারা র বয়ে চলা দেখলাম, দূর থেকে জলপ্রপাত খানিক বুঝে নিলাম। সময়ের দিকে নজরদারি না করলেই যে নয়কো !!! এই জলপ্রপাত এর পাশ ঘেঁষে গড়ে পিঠে নেওয়া পার্কে টিকিট কেটে ঢোকার সময়ের চেয়ে ফেরার সময় ভিড়ের বাড় বাড়ন্ত দেখে বুঝলাম বোঝাই হয়ে ... পরবর্তী স্থান গুলোতে জনসমাগম ভালোই হবে। ফিরতি অল্প পথ জোড়া গল্প লিখতে লিখতে হাঁটি হাঁটি পা পা করে কম কম  চড়াই পথ বেয়ে উঠে এলাম। এরপরেই খানিক ভুট্টা, কোল্ড ড্রিঙ্কস রসদ শরীর নামক ইঞ্জিনে ভরে নিয়ে সুটিং স্পট নামের অধিকারী এক স্পটে হাজির হলাম। এখানেও টিকিট গ্যাঁড়াকল পেরিয়ে আঁকা বাঁকা ঢাল বেয়ে ওপরের দিকে উঠে গেলাম। এই পথের সাথে ছোট বেলার ড্রাইং খাতায় আঁকা পথের ছবি মিলেজুলে একাকার হয়ে গেল। সবুজ ঘাসের মধ্যমণি হয়ে পথ ওপরে উঠে গেছে। খানিক দম নিয়ে হাঁপ সামলাতে সামলাতে আমরা ওপরের খানিক চাতাল সদৃশ সমান অংশে পৌঁছলাম। ওপর থেকে চারিদিকের ভিড় করে আসা প্রকৃতি যেন তার শোভা নিয়ে আমাদের তাক লাগিয়ে দিল .... কি অদ্ভুত ভাল লাগা মন জুড়ে ছড়িয়ে পড়ল !!! যদিও ক্ষণকাল আগে পুপে র সাথে হাল্কা দ্বৈরথ হয়ে গেছে তখন। মা আমার চোখ কপালে তুলে কাদার মধ্যে হেঁটে জুতো ও জামায় কাদার পোলকা ডট ফেলে গট গট করে সখীর সাথে এগিয়ে যেতেই চটপট খান কতক বাক্যবাণ বর্ষে দিয়েছি , আর অদ্ভুত ভাবে সে সব গায়ে মেখে নিয়ে ( যেটা সাধারণত শুকনো ধূলোর মতন ঝেড়ে ফেলে ) গাল ফুলিয়ে ঘুরছিল সে । শুটিং স্পট কি তা বলে বৃথা যাবে ??? সকলে কলকেতা থেকে কেতা যুক্ত এক রঙা হলুদ পোশাকে  উটির ঠাণ্ডায় বসন্ত বাহার গাইবার প্রস্তুতি নিয়ে এসেছি ... তাই ভুললে হবে নাকি ???? আমরা সব হেলে, দুলে; আকাশ দেখে , আধা গড়িয়ে পড়ে নানান রকমের ছবি তুলে ফেললে , তার দেখাদেখি দলের পুরুষ সিংহরা আমরাও কম যাই না ভাবে  মন ও মুখে তার প্রকাশ করে বাহারের ছবি তুলে ফেলল ... ছবি তোলার পর একে একে সকলে ঢাল বেয়ে নেমে এলাম, পথের ধারের স্টল থেকে ফের মুড়ি মাখা সহ আরো টুকটাক খেয়ে খিদে পাই পাই ভাবটা কে কিঞ্চিত চাপা দিলাম। এবারে এগিয়ে চললাম বলিউড স্যুটিং খ্যাত পাইন ফরেস্টের দিকে । যেখানে গান ও নাচ উভয়ে সঙ্গত করে বলিউডী নায়ক নায়িকা গণ অনেক কালজয়ী দৃশ্য আমাদের উপহার দিয়েছেন। সেখানে পৌঁছে দেখি সত্যিই " গজব কা হ্যায় দিন" সাথে এত লোকের মধ্যেও মন একা হয়ে গুনগুন ধ্বনি তুলতে শুরু করে গেয়ে ফেলেছে " চাহে তুমি কুছ না কহো ম্যায়নে শুন লিয়া " .... সাথে আরেক সুর উঁকি দিয়ে শুরু করেছে ... "মেরা দিল ভী কিতনা পাগল হ্যায়। "এত্তো সব বলিউডী গানের স্মরনীয় দৃশ্য স্মৃতির শরণী বেয়ে ঝাঁপিয়ে হাজির, তার সাথে নানান ধরণের ছবি তোলা, সব মিলে সে এক ভারি ব্যাস্ততম ব্যাপার চলতে থাকল , তবে শেষ হলো একদম ছায়াছবির বদলে বাস্তবের বৃষ্টি দৃশ্য দিয়ে , পাইন বন পেরিয়ে টেম্পো ট্রাভেলারে ওঠার পথে একদম জোরালো বৃষ্টির ধারায় ভিজে ঝুপ্পুস হয়ে গেলাম দলের ৭০%।

 কি হবে কি হবে ভাবতে ভাবতেই আমরা এবার খ্যাটনে মন দিতে খাবার জায়গায় ঢুকে পড়লাম। অন্বেষা এখানকার আপাত বাড়ি অর্থাৎ হোটেলে ভিজে পোশাক পরিবর্তন করতে যাওয়া হচ্ছে কিনা জিগাতে আমি উত্তর খুঁজতে খুঁজতে শেষমেষ খাবারের মনোনিবেশ করে ফেললাম .... নন-ভেজে ভিড়ে গেলে আমার আবার আর কিছু  নজরে ধরা দেয় না । এরপরে দেখলাম গায়ের জল গায়েই গায়েব। আমরাও খাবার খেয়ে বেরিয়ে পড়লাম .... এবারের গন্তব্য ছিল চা আর চকোলেট ফ্যাক্টরি ঘুরে দেখা। আমাদের বাহন চালক জয়সন এর কথার যুক্তিতে আমরা পৃথকের বদলে এক‌ই চত্বরে অবস্থিত চা ও চকোলেট দুয়ের কারিগরি দেখতে হাজির হলাম এক বিশাল দ্বৈত ফ্যাক্টরি চত্বরে .... এক সম্পূর্ন নতুন অভিজ্ঞতায় রিদ্ধ হলাম। চা তৈরির কর্মযজ্ঞ চাক্ষুষ করলাম, চকোলেটের প্রস্তুতি তুলনায় সংক্ষিপ্ত। হয়তো সম্পূর্ণ আয়োজন দেখানোর কোন বাঁধা থাকলেও থাকতে পারে ... চায়ের প্রস্তুতির তুলনায় চকোলেটের প্রস্তুতি সংক্ষিপ্ত কর্মযজ্ঞ যেন একটু হতাশ করতে না করতেই ... সামনের ডিসপ্লে বাক্সে থরে থরে সাজানো চকোলেট হতাশা কে নিমেষে ভাগিয়ে দিল । 

এরপরে কোন না কোন চার্চের দর্শন করে আমরা ঘরে থুড়ি হোটেলে ফিরে যাব , এমন ভাবনায় ভাবিত হলেও চার্চ দর্শন হল না সেদিন। কোন কারণে খান দুয়েক চার্চের দুয়ারে হাজির হলেও ঝাঁপ বন্ধ থাকার দরুন তা সম্ভব হয়নি। এরপর আগের দিন গুলো র তুল্য মূল্য বিচারে অনেক আগে যখন গোধূলি বেলায় হোটেলে ফিরলাম, তখন মনে আরেক রকমের আনন্দের উদ্রেক হল। কারণ আগেভাগে ফেরা মানেই একটা নিটোল আড্ডা মুখর খাই দাই সহ বিশ্রামের ঢালাও আয়োজন। যদিও এক সখি ও তার ভ্রাতাশ্রী আসল ঘরে ফেরার পরেই পরেই আসন্ন পরীক্ষা র পড়া ঝালাই করতে গেল আপাত আবাসের ঘরে , মন প্রাণ খানিক খানিক আড্ডা ঘরে থুয়ে। আরেক সখীর ওসবের বালাই নাই ... মা - বাবা  দুজনেই যদি ওসবের কামাইতে  সিদ্ধহস্ত থাকে , তো কে আর কাকে দূষবে ??? মায় অন্বেষা ওবধি এতো দিন পড়তে না পেরে মনের দুঃখ দূর করতে পড়তে গেল ঘরে ... আমি খানিক হতাশ হয়ে , দুঃখ কাটাতে আমার কন্যা ও খুশি র আড্ডা সহ নাচাগানাতে মনোনিবেশ করলাম। এরপর খাবারের পর্ব মিটিয়ে ঘুমের দেশে র‌ওনা দিতেই হলো .... কারণ , পরের দিন উটি থেকে ছুটি করলেও আরো নতুন নতুন গল্পের ঝুলি খুলতে খুলতে আমাদের বেড়ানোর শেষের এপিসোডের দুয়ারে পৌঁছে যাব তো !!!! 


Comments

Popular posts from this blog

আক্কেল সেলামি

বেড়াতে গিয়ে মজারু ৬০

বেড়াতে গিয়ে মজারু ৬৭