বেড়াতে গিয়ে মজারু ৬২

 বেড়াতে গিয়ে মজারু ৬২

মাইশুরুতে শুরু হল আমাদের প্রথম রাউন্ড রাত্রি যাপন , রাতের খাবার খেতে গিয়ে সকলে মনের মতন উওর ভারতীয় তাওয়া রুটি , নান , চিকেন কারি , ভাত , ইয়ালো ডাল আর আলুজিরা পেয়ে যারপরনাই মন খুশ করে পেট পূজো সেরে যে যার মতন দিনের শেষে ঘর ও ঘুম মুখী হলাম। পুপে আবার তার অন্বেষা মাসিকে সাহস দিতে তার সাথে ঘুমুতে সঙ্গ দিতে গেল ... সাথে র‌ইল ফোন নামক আপদ । বেড়াতে বেরিয়ে আর না না ধ্বনিতে হোটেল মুখরিত না করে ... অল্প নিষেধ বার্তা কানে গুঁজে দিলাম। কিন্তু তা বোধহয় আমাদের ঘরেই রয়ে গেল , কানে ঢুকলো না ... তার শারীরিক প্রমাণ মিলল ঠিক দুদিনের মাথায়। আসলে বাঁধন একটা আছেই , যা অদৃশ্য ... সেই বাঁধন খানিক হাল্কাভাবে রাশ ধরে রাখা বাঁধন। এঁটে চেপে বসা বাঁধন নয় .... আরো একটু আলগা করলেই লাগাম ছাড়া ভাবে ভাসতে শুরু করে কিছু না কিছু গোল পাকিয়ে ফেলে , নিজের পরিধির বোধ এখন পর্যন্ত জাগেনি আমাদের কন্যার .... আর তখন আমাদের , ওকে বোঝানোর পথ খুলে যায়, যা বাঁধা দেওয়ার কারণ বিষয়ক ... একবার পুরীতে মৌ এর ঘরে ঘুমিয়ে কিছু গোল বাঁধিয়েছিল ... কিছু সমস্যা র কথা লজ্জা করে মৌ আন্টিকে বলতে না পেরে গোল !!!! সব জায়গায় ঠেকে শিখতে ছেড়ে দেওয়া যায় না বটে , তবে কিছু কিছু ঠেকে শিখে নিলে আখেরে ভালো। ক্লান্ত শরীরে বিছানায় ল্যান্ড করে ভয়ানক নরম গদির মাঝে পুরো ডুবে গিয়ে মহা ঝামেলা জনক অবস্থায় নিদ্রা গেলাম। নরম নরম ওমন গদি ভারি পীড়া দায়ক, বিশেষ করে যারা ওজনদার 🥹 ওজনের ভারে নরম গদি কাবু হয়ে মালিককে নিয়ে নিম্নে ঢুকে যায় । নড়াচড়া রহিত প্রায় হয়ে ঘুম দিলাম ... রাত কেটে এক মিষ্টি ভোর উপহার দিল মাইশুরু ... ভোরে ওঠার অভ্যাস বেড়াতে গিয়েও রেহাই দেয়না আর নিদ্রা যখন gone আমাকে হতেই হল on .... বারান্দায় মুখ বাড়িয়ে ভীষণ রকম নস্টালজিক হয়ে গেলাম ...ছোটকালে  পূজো পেরিয়ে যখন আমরা গুটি গুটি দীপাবলি র দিকে পা বাড়াতাম .... এমন হিম পড়া হাল্কা ঠাণ্ডা মেখে আমার শহর আমাকে হাতছানি দিয়ে ডাকতো। হিমে ঠাণ্ডা লাগার ভয়ে মা আমার মাথার চুল ঘেঁটে স্কার্ফ বেঁধে দিত । সারা বছরের তেল চপচপে চুল গুলো ওই সময় একটু উড়ু উড়ু হোতো শ্যাম্পু মেখে তাকেও মা হিম হিম করে হিমঘরে পাঠিয়ে দিতেন .... 

যাক সে কথা , এদিকে র ঘরের পিতা জি জাগন্ত হয়েই মেয়ে কৈ মেয়ে কৈ করে হাঁপিয়ে কাঁপিয়ে একশা শুরু করতে , মেয়েকে অন্বেষা র ঘর থেকে আনা করতে গেলাম। দেখি তিনি তখনো ঘুমে জাগরণে র মাঝে দোল খাচ্ছেন ... খুব স্বাভাবিক ...  ঘুমের বদলে বেশি টা ফোনে কেটেছে  রাত !! 

অল্প পরেই সকলে সাজুগুজু করে জমা হলাম complimentary breakfast এর দরবারে। হাজারো পদ দেখে খানিক ট্যারা হয়ে গেলাম সকলেই। খানিক ঘুর পাক খেলাম ঘরময় এবং তারপরেই মিলিয়ে মিশিয়ে চেনা জানা তেল বর্জিত কিছু পদ নিয়ে সকলে ই জলখাবার খেয়ে ভাগ যোগ করে দুই গাড়িতে উঠে র‌ওনা দিলাম , কুর্গের দিকে । 

কুর্গ এক ছোট্ট পাহাড়ি জনপদ। যার সৌন্দর্য অনাবিল। কুর্গে আমার থাকার খুব ইচ্ছে ছিল ... কিন্তু সময়াভাবে শুধুমাত্র যাওয়া আসা র মাঝে কুর্গ কে ফিট করে নেওয়ার কথা হয়েছিল। কুর্গের প্রকৃতি নাকি সেজে ওঠে ভোরের কুয়াশা মেখে , কিন্তু ভোর দেখার উপায় নাস্তি .... বলেছিল আমাদের পরিচিত এক দক্ষিণ ভারতীয় দাদা , আমরা বেলাবেলি ওদিকে ঘোরাঘুরি করে নিয়ে আবার ঘরে ফিরে আসব ... এই ছিল কথা। এই রকম ভাবনায় রাজি হয়ে , তবেই কুর্গে যাওয়ার স্বপ্ন নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। নেই মামার থেকে কানা মামা ভাল ... এই সব ভাবনা মনে জড়ো হয়ে , ভাবনাটা কে  দড়ো করছিল ... একেই কোদাইকানাল কে এরা সময়কে শিখণ্ডী সাজিয়ে কাঁচি করে , মনে সেই পাহাড়ী এলাকাকে খোদাই করতে দেয়নি। কুর্গের কথা শুনেছিলাম আমাদের পুপের এক বান্ধবীর মায়ের কাছে ‌.... তার বড় কন্যার ব্যাঙ্গালোরে পড়ার সুবাদে ওদিক যাতায়াত ছিল। তখন ই শোনা , এবার এক পাড়াতুতো মাসিমা র কাছে শুনলাম, কুর্গের মেয়েরা নাকি দেখতে ভারি সুন্দর হয় ... থাকা থাকি হয় নাই তাই দেখাদেখি র scope ও হয় নাই এবারে ... কুর্গে আমরা গিয়েছিলাম বুড়ি ছুঁতে ... খান কতক স্থানে ঘোরাঘুরি করে , মাঝে খাওয়া দাওয়া সেরে আরো কিছু দেখে ফেরার কথা আমাদের। প্রথমেই কুর্গে পৌঁছে আমরা নেমে পড়লাম অ্যাবি জলপ্রপাত দেখতে , তার আগের পাহাড়ি এলাকার ঠাণ্ডা র জল্পনা গাড়ি থেকে নেমেই ফুস করে হুস হয়ে গেছে তখন ... গাড়ি থেকে নামার পর পরই শরীর ঠাণ্ডা করতে সকলে ডাবের জল , ডাবের শাঁস খেয়েছি আশ মিটিয়ে। জলপ্রপাত দেখতে অনেক খানি নামতে হল থামতে থামতে ... জল পড়ার শব্দ শুনতে শুনতে এক সময় মন ভরানো জলের ঝরে পড়া দেখলাম  !!!! যুগলে, দলে দলে, দোকা, ধরাধরি, ছাড়া ছাড়া সব রকম ভাবে স্মরনীয় ছবি তুলে চললাম এগিয়ে ... পরের গন্তব্য "রাজা সিট পার্ক" এ । কোন রাজা এখানে বসতেন জানা নেই , আমরা পার্কে র সাজানো বাগান পেরিয়ে, পার্কের অন্যতম আকর্ষণ ভিউ পয়েন্ট হাজির হলাম। সেখানে মেলাই লোক জন । ওপর থেকে পাহাড়ি কুর্গ কে দেখার সাথে সাথে এখানেও ছবির বাহার নাকি বাহারি ছবি তোলা হল বসে , হেলে, দাঁড়িয়ে ... হেলাফেলা না করে ... এখানে আলোচনা না করেই দেবাশ্রিতা আর আমার এক রঙা পোশাকে আমরা তাক লাগানো ছবি তুলে ফেললাম , অবশ্যই সে সব তাক ধিনা দিন আমাদের একান্ত ব্যক্তিগত , অন্যজনে তাক লাগানো ছবিতে নানাবিধ ফাঁক দেখতেই পারে !!! .... এবারে দেখা গেল পেট বেশ জানান দিচ্ছে regarding খিদে ... গাড়িতে চেপে আমরা মার্কেট প্লেসে হাজির হলাম খেতে ... খাবার জলদি খেয়ে নিচের দোকানে জড়ো হলাম ... এদিকে আমার তিনি যথারীতি অন্য দিকে ... দেখাদেখি কেনাকেনি হলেও, আমার হলো না , কথা না বলে কিনতে কিন্তু কিন্তু লাগছিল ... দোকান থেকে বেরিয়ে, ড্রাইভার দাদা র তাড়া খেয়ে খোঁজ লাগিয়ে কর্তা মশাই সহ বাকি ৮জনের দেখা পাওয়া গেল আরেক দোকানে ‌‌.... এইবার আমার কিন্তু কিন্তু ভাবের অভাব দেখা দিল আর ? অ্যাটাক মোডে সকলেই কিছু না কিছু বগলদাবা করে এগিয়ে চললাম ... কফি প্ল্যান্টেশন সহ কফি প্রসেসিং কারখানার দিকে । কুর্গ এদিকে র কফির চাষের অন্যতম স্থান । সেখানে পৌঁছেও আমরা মত বদলে ফেরার পর ধরলাম , কারণ পাহাড়ি পথে রওনা হয়ে আবার মাইশুরু ফিরতে হবে , তখন প্রায় প্রায় বিকেলের দিকে আমরা পৌঁছে গেছি। ঠিক হল ফেরার পথের কুশল নগরে কুশল বিনিময় করে নেব ওখানকার গোল্ডেন টেম্পলে । আগেভাগে ব্লগে দেখে রাখা এক ক্যাফে র কথা ভাবলেও শেষমেষ সে সব ও আরো কিছু spot ঘচাং ফুঃ করতেই হল। কখনো কোনদিন যদি .... , যদিও সে গুড়ে বালি ☹️...

সন্ধ্যা নামার ঠিক আগে আমরা কুশল নগরের বৌদ্ধ মনাস্ট্রি গোল্ডেন টেম্পলে র সামনে নামলাম , তখন হাল্কা বৃষ্টি শুরু হয়েছে  । ভিতরের চত্বরে ঢুকতে না ঢুকতেই বৃষ্টি বন্ধ হল আর গেটের কাছের এক লতানে গাছের ফুল দেখে দুই সখী ( আমার কন্যার ও তার বান্ধবী ) আনন্দে ফুলে ফেঁপে একসা !! ও নাকি জাপানি ফুল । 🤔 তো ???? বঙ্গ মায়ের ইঙ্গ সন্তান তো হয় জানি ... এতেও পরিবর্তন !!! বাপ রে ..... 

অজস্র ফুল , ছাত্রাবাস , মূল মন্দির সব দেখে বেরিয়ে আসার সময় আবার বৃষ্টি নামল ... কিন্তু বেরিয়েও আমরা বেরলাম না , বৌদ্ধ মনাস্ট্রি সংলগ্ন সার বাঁধা দোকানের একখান দোকানে মহিলা মহল কেনাকাটা তে লেগে পড়লাম  ... মহিলা কূলের গার্জেন কূল দিশা না পেয়ে মনাস্ট্রি র এক গাছের তলে ধরাশায়ী হলেন থুড়ি অপেক্ষমাণ হলেন । সন্ধ্যা হলো ... আলো জ্বলে উঠলো ... আমরা মার্কেটকে বিদায় জানিয়ে গাড়িতে উঠে পড়লাম। এবারে ফেরার পালা ... যদিও পথে একটা ছোট্ট কাজ সারার কথাও আগেভাগে বলে কয়ে র‌ওনা দিলাম। আসলে আসার দিন বিমানবন্দরে খানা তল্লাশি তে কোমর বন্ধনী অর্থাৎ বেল্ট খুলে দেখাতে হয় যে বলিউডি মভির মতন ওতে মণি মানিক্য কিছুই গাঁথা বা অন্য কোনভাবে লুক্কায়িত আছে কিনা। সে সব পেরিয়ে আবার পরার সময় বন্ধন টাইট করতে গিয়ে পটাং করে হাতে বেল্টের বন্ধন দানকারী অংশ খান খুলে এলো ... কাউকে বোঝাতে ই পারলাম না যে কতকটা রোগা হয়ে ই এই বিপত্তি। শুনলে তবে না ?? তারা সব আমার কথাতে আপত্তি জানিয়ে ভয়ানক না হলেও মিটি মিটি হেসেছিল ... আমার কর্তা, ঘর শত্রু বিভীষণের মতন ব্যাপারটাকে বিপরীত দিক ধরে ব্যাখ্যা করে যা বললে তার অর্থ হল যে ,  বেল্ট আমার কোমরের সাথে এঁটে উঠতে না পেরে শহীদ হয়েছে ... তো একখান বেল্ট অতি অবশ্যই দরকার হয়ে পড়েছিল ।ফিরতি পথে বেল্ট কিনতে গিয়ে কর্তা মশাই বুঝলেন , চাক্ষুষ করলেন ... বেল্ট ছেঁড়ার প্রকৃত কারণ। আমি মোটা বটেই, তবে হালে চেষ্টা করে কিছু ওজন কর্তন করেছি !!! 

বেল্ট কিনে আমাদের গাড়ি আগে ভাগেই হোটেল ফিরল ... অন্য গাড়ি থামতে থামতে ফিরল ... কারণ ??? পাহাড়ি পথে গাড়ি র সাথে পেট গুড় গুড় শুরু হয়েছিল যে এক সখি র .... পরে অন্য সখি অন্য দিনে গাড়ি থামিয়ে পথ চলবেন .. এ আর নতুন কথা কি ??? 

হোটেল ফিরতে আমাদের সেদিন সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত হয়েছিল , ঘুরতে গিয়ে যেহেতু ঘোরাঘুরি তে আমরা প্রাধান্য দিয়ে থাকি ... তাই একটু পরেই আমরা ফ্রেশ হয়ে পরের দিনের ভাবনা ভেবে রাতের খাবার ঘরেই আনা করিয়ে খেয়ে নিলাম, অন্বেষা আমাদের সাথ দিল। হোটেলে আমাদের ঘর সংলগ্ন বারান্দায় বসে গরম গরম ভাত খেলাম সঙ্গে আনা মাখন আর আলু ভাজা সহযোগে ... এরপরে পুপে গেল মাসির ঘরে সাথে নিয়ে ফোন , আবার বারণকে সাথে দেওয়ার চেষ্টা করলাম বৃথা আর এরপরেই আমি আবার নরম গদি আর ঘুমে তলিয়ে গেলাম ... 

Comments

Popular posts from this blog

আক্কেল সেলামি

বেড়াতে গিয়ে মজারু ৬০

বেড়াতে গিয়ে মজারু ৬৮