বেড়াতে গিয়ে মজারু ৬১

 বেড়াতে গিয়ে মজারু ৬১

মাইশোর এখন যুগের হাওয়া গায়ে লাগিয়ে নাম বদল করে হয়েছে মাইশুরু। মহিষাসুরের দেশ নাকি এই মাইশোর / মহিশূ‌র। এখানকার চামুন্ডা পাহাড়েই আমাদের মা দূর্গা দুষ্টের দমন করেছিলেন বলে কথিত , বধ করেছিলেন মহিষাসুরকে। আমাদের মাইশূরু ডাইরি সেদিন শুরু হল কিছু পরেই। ঘুরতে যখন গেছি ঘুরু দিয়ে ই যে তা শুরু হবে সে আর এমন কি কথা ? ঠিক হল পথের ক্লান্তি দূর করতে সকলে ফ্রেস হয়ে , দুপুরের খাবার খেয়ে বেরিয়ে পড়ব মাইশোর প্যালেসের উদ্দেশ্যে। তারপর বৃন্দাবন গার্ডেন ঘুরে হোটেলে ফিরে আসব।

কলকাতা থেকে নিয়ে আসা ঘরোয়া খাবার সব তখনো পেটে পোরা হয় নাই , ঠিক হল হোটেলের খাবারের সাথে ঘরের খাবারে রসনা তৃপ্তি হবে মিলিয়ে মিশিয়ে ‌... কিন্তু হোটেল কর্তৃপক্ষ দুই প্রদেশের মিল মিশ ভাল চোখে দেখলেন না ... অগত্যা পরের জন্য তা ঘরে ( হোটেলের) রাখা হল ... পরে সে সব বিন ( dustbin) মুখী হলো সঙ্গে করে নিয়ে গেল আমার দুখান চামচে ... ওরা ওদের নাম স্বার্থক করে খাবারের চামচা হয়ে ভিন দেশে রয়ে গেল 😝।

আমরা চট জলদি খেয়ে আরেক কম ধড়াচূড়োয় সজ্জিত হয়ে রাজার বাড়ি দেখতে চললাম ‌। আমাদের দুখান গাড়ির একজন চালকের নাম ছিল রঘু। কল্লোলিনী, তিলোত্তমা আমাদের শহরে রঘু ডাকাত নামক চলচ্চিত্র রীলিজ করেছে , আর সেখানে পূজো উপলক্ষে কিলবিলে জনতাকে ছেড়ে আমরা এখানে ভিন্ন রাজ্যে রাজ বাড়ি চলেছি আরেক রঘুর সাথে আর এখানে ও ভিড় ভড়কে দেওয়ার মতনই ... ঠিক ছিল ,  রাজবাড়ী ও তার আলোয় উদ্ভাসিত আরেক রূপ দেখে নিয়ে, আমরা হব বৃন্দাবন (গার্ডেন) মুখী ... কিন্তু ঠিক করা ভাবনাকে, ভিন্ন খাতে ব‌ইয়ে দিল আমাদের এদিকের রঘু জী !!! ফলে ভাবনার নতুন দিশা শুধুমাত্র রাজপুরী জুড়ে ঘোরাঘুরি তে সীমাবদ্ধ থাকল। একে একে টিকিট কেটে আমরা রাজবাড়ি তে ঢুকলাম। ওমা গো !!! গোটা কলকাতা র পূজোর ভিড় যেন পিছু পিছু এসে হাজির হয়েছে বটে !!!!  মা দূর্গা নিশ্চিত বলেছেন মনে মনে ... আমার শহরের ভিড় উপেক্ষা করা ??? দেখ কেমন লাগে ?😀

বিশাল ফটক পেরিয়ে ছড়ানো চত্বরের সুন্দর বাগ বাগিচা পেরিয়ে দুদিকে  দাঁড়িয়ে আছে বিস্তারিত রাজবাড়ি। টিকিট কেটে , জুতো জমা করে , একজন সরকারি গাইডকে পাকড়াও করে আমরা রাজবাড়িতে প্রবেশ করলাম। কাতারে কাতারে জনতা , যার বেশির ভাগই ওই রাজ্যের বাসিন্দা,  সাথে আমাদের মতন কিছু বাঙালি ভ্রমণকারী এগিয়ে চললাম দেখতে দেখতে , জানতে জানতে । কারুকাজ ও তৈলচিত্র র ভিড়ে ক্যামেরা বাগিয়ে আমি প্রায়ই দলছুট হয়ে পড়ছিলাম। কিন্তু প্রতিবারই অভয় দানকারী ছিল অন্বেষা ... "আমি আছি , চলো , ওরা এগিয়ে গিয়েছে।" কলকাতা র পূজোর ভিড়ের মতন ভিড়ের ভরপুর স্বাদ নিতে নিতে এক জায়গায় আর্ট গ্যালারি র বাইরে  র‌ইলো ( যারা সকলে কম বেশি বদ্ধতার ব্যরাম যুক্ত‌ ও ভিড় না পসন্দ) ... আমার কর্তা মশাইও পুপে সহ  দলের মধ্যমণি হয়ে র‌ইলেন সেথায়। ভিড়ে আমি চট করে ভিড়ি না , কিন্তু এখানে তো বারংবার আসার উপায় নাস্তি , তাই যতটা দেখা সম্ভব ... এই ভাবনার হাত ধরেই আর্ট গ্যালারি পার করলাম। থ্রি ডাইমেনশনাল পোট্রেট ... অমূল্য , অসম্ভব সুন্দর শিল্প কর্ম দেখতে দেখতে গ্যালারি র বাইরে এসে অপেক্ষারত বাকিদের সাথে যোগ দিয়ে ... এগিয়ে চললাম। বাকিদের কি কি দেখায় ফাঁকি ঘটলো তার হদিস ভিড়ে হারিয়ে গেল ... কলকাতার পূজোর সদৃশ ভিড় কথা বলার সুযোগ না দিয়ে আমাদের দলকে বন্ধনহীন গ্রন্থিতে বেঁধে ফেলল। এগিয়ে সিঁড়ি বেয়ে নেমে আবার উঠে আমরা এক দরবার সদৃশ হলঘরে হাজির হলাম ... একপাশে র টানা অলিন্দ থেকে প্যালেসের বাইরের দৃশ্য সহ খানিকটা দূরে অবস্থিত চামুন্ডা পাহাড় দেখা যাচ্ছিল। জনতার ঢল এবার এক সোনার পাতে মোড়া সভাকক্ষে প্রবেশ করল সেখানে সিংহাসন দেখার পৃথক টিকিটে আমরা মহিলা কূল এক পার্টিশনের পিছনে গেলাম সুসজ্জিত সেই প্রাচীন সিংহাসন চাক্ষুষ করতে ... সংসারে আমাদের অবস্থান যাইহোক না কেন সিংহাসনে বসে ছড়ি ঘোরানোর ইচ্ছে কম বেশি থাকতেই পারে ( সত্যি তাই পারি না পারি ) তাই তা দেখার বাসনা আমাদের ওদিকে নিয়ে গেল ... এদিকে দলের পুরুষ সিংহরা ওসব তুচ্ছ বিষয়ে তেমন আমল দিলেন না ... সিংহাসনে না বসেই রাজ্যপাট থুড়ি সংসারপাট সামলাচ্ছেন হৈ হৈ করে ... আর কর্ত্রী র ভুল ধরে মেলাই আনন্দও পাচ্ছেন ..... তবে !!! 

এক সময় ঘামতে ঘামতে আর নামতে নামতে প্রাসাদ থেকে নেমে এলাম। এবার ভিড়ে ভড়কে না গিয়ে  জমা করা চটি জুতোর অধিকার বুঝে নিয়ে সামনে এগিয়ে গেলাম গলা ভেজানোর জন্য চায়ের খোঁজে .. তখনো আমাদের আরেক অনবদ্য আলোকিত প্রাসাদ দেখা বাকি ...যা প্রতি রবিবার সহ শুধুমাত্র বিশেষ বিশেষ দিনেই দেখার সুযোগ ঘটে সন্ধ্যা ৭টিকায়। আমরা ওখানে ছিলাম নবরাত্রির সময় । যা অতি অবশ্যই বিশেষ সময়, বিশেষ দিন । 

দিনের আলো আসতে ধীরে সন্ধ্যায় মিশছে তখন ... আমরাও প্রাসাদ চত্বরের একপাশে চা , ছোটরা আইসক্রিম হাতে শরীরকে যার যার মতন ধারায় চাঙ্গা করতে লেগে পড়েছি ... হঠাৎ দেখি প্যালেসের সিকিউরিটি কর্মীরা সামনের রাস্তার জনতাকে পাশে সরতে অনুরোধ করছেন , সাথে সরিয়েও দিচ্ছেন ক্ষিপ্রতার সাথে ... আমাদের শহরে সাধারণত কোন মন্ত্রী সান্ত্রীর আগমনে এমন ধারার ব্যতিব্যস্ত চিত্র দর্শন করে থাকি ... তেমন ভেবে , চায়ের ভাঁড়ে মন দিলাম, আমার মনের মতন ঘন দুধের মিষ্টি চা , আহা .... কিন্তু কিছু পরেই মন চায়ের ভাঁড় থেকে লাফ দিয়ে পথের দিকে হামলে পড়ল ... খানিক মনকে সামলে নিয়ে কি দেখলাম জানো ??? দশেরাতে মহিশূরে যে হাতিরা মানুষ সহ সুসজ্জিত হয়ে নগর পরিক্রমা করে ... তারা আসন্ন অনুষ্ঠান উপলক্ষে পথ পরিক্রমার মহড়ায় বেরিয়েছে । আমাদের দলের এক খুদে সদস্যা খুশি , এখানে আসার আগে জেনেই এসেছিল এদের কথা , তার থেকে আমরাও জেনেছিলাম এই শোভাযাত্রা লীড করার লীডিং গজরাজ ভীমা র কথা । যে অত্যন্ত প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত । মানুষের কথা বোঝেও শোনেও ... তবে অবশ্যই ওদিকের দেশোয়ালি ভাষায়। আমরা ধাঁড়ি গেঁড়ি সকলেই ছানাবড়া চোখ মেলে তাদের গজেন্দ্র গমন দেখলাম। একসাথে জনা দশেক হাতি এই প্রথম সামনাসামনি দেখলাম। হাতির চক্করে আলোকোজ্জ্বল প্রাসাদ আমাদের খেয়ালে ধরাই দেয়নি। হাতির দল চলে যাওয়ার পর হঠাৎ সকলে খেয়াল করলাম যে সন্ধ্যা পেরিয়ে গেছে আর সমস্ত রাজবাড়ি আলোকিত রূপে রূপসী হয়ে সেজে উঠেছে। আমরা চা চত্বর থেকে বেরিয়ে এগিয়ে চললাম প্রাসাদের সামনের দিকে ... কিন্তু সামনে পৌঁছনোর অনেক আগেই কোনাকুনি একটা জায়গা থেকে আলোকিত প্রাসাদকে খানিক দেখতে পাওয়া গেল ... সেখানে ই আলোকের ঝর্ণা ধারায় মাখামাখি করা প্রাসাদের একাকী ও আমাদের সাথি করা ছবি একের পর এক মোবাইল ও আমার গোদা ডি.এস.এল.আর এ বন্দী হতে লাগলো। চারপাশে আলোয় উদ্ভাসিত চত্বর , প্রাসাদ পুরো দূর্গা পূজার কলকাতায় ফিরিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল ... আমি , শান্তশ্রী দি আর অন্বেষা আরো সামনে যতটা এগিয়ে যাওয়া সম্ভব ততটা জনতার মাঝে সাঁতার দিয়ে গেলাম, একসময় আর এগোনোর অসম্ভব বোধ আমাদের ফিরিয়ে আনল ... দলবদ্ধ হতে আমাদের দলের কাছে ফিরলাম। এবার হোটেলে ফেরার পালা ... কিন্তু পরন্তু ... পথে নেমে ঝকঝকে আলো আর গিজগিজে ভিড় দেখে সকলে ট্যারা হয়ে তৎক্ষণাৎ গাড়ির চালক রঘুকে ফোন করা হল ... রঘুর south Indian English ওই হল্লাহাটির মাঝে উদ্ধার করতে পুরুষ সিংহদের বেগ পেতে হল ... অনেক অপেক্ষার পর যাও বা মোবাইল লোকেশন দেখে রঘু হাজির হল , তাকে আর রামকুমার দা কে follow করতে করতে তাক লাগানো ভিড়ে আমরা পথ হারা পথিক হয়ে গেলাম এক তিন মাথার মোড়ে এসে ... জয় মা !!! আমাদের হিল্লোল ওরফে হিলুর বেলুন কেনার  ক্ষণেই আমরা হারাধনের ‌৯ টি একদিকে আর রঘু সহ বাকি দুইটি ( বাপ-বেটি ) আরেকদিকে। আলো আর ভিড়ে ডানদিক ও বাঁদিক এই করে করে আর ফোনাফুনি করে অবশেষে আমরা দেখা পেলুম বাকি দুই এর ... তারপর ???? চোখ কান বুঁজে সবাই দুই গাড়িতে গদিয়মান হয়ে হুঁস করে ফিরে এলাম হোটেলে .... পরের দিন যাওয়ার কথা আরেক গন্তব্য কুর্গ ... তবে no থাকা , গিয়ে ঘুরে আবার মাইশুরু থেকে শুরু করতে ফিরে আসা ... 

@শিল্পী

Comments

Popular posts from this blog

আক্কেল সেলামি

বেড়াতে গিয়ে মজারু ৬০

বেড়াতে গিয়ে মজারু ৬৮