বেড়াতে গিয়ে মজারু ৬৮
বেড়াতে গিয়ে মজারু ৬৮
পূজোর ছুটির পরে আসে ছোট্ট মতন শীতের ছুটি । সেই ছুটির যখন দেখা মিলবে মিলবে করছে , হঠাৎ ই আমাদের গত শীতের বেড়ুর সহযাত্রী গণ দূরাভাষের অপর প্রান্তে হাজির হয়ে নতুন কোথাও ঘুরে আসার প্রস্তাব দিয়ে ফেলল। শীতের ছুটি আর পূজোর ছুটির মধ্যে যতই বছর খানেকের অন্তরায় থাকুক, পূজোর ছুটির পরে শীতের ছুটির যাত্রা পথের ব্যবধান অতিরিক্ত কমতির দিকে। এ অঙ্ক বেশ গোলকধাঁধা টাইপের । যাক সে কথা পত্রপাঠ বলো বা ফোনপাঠ বা ফোন কথন যাই বলে তাকে চিহ্নিত করো না কেন ,তৎক্ষণাৎ তাকে নাকচ করে দিলাম। এতো ঘন ঘন বেড়াতে যাওয়ার ভাবনা ভাবলে কর্তা মশাই বিবাগী হতে পারেন , আগের ঘুর্ণনের খরচের শোকে মাঝেমধ্যেই ফোঁস ফোঁস করে দীর্ঘশ্বাস ফেলছেন । বেড়াতে বেরিয়ে পড়লে ,তেনার মেজাজটা আসল রাজা হলেও, ঘরে ফিরেই রাজা মশাই নিপাট মিতব্যয়ী ভদ্র বাবু হয়ে যান। যিনি তখন সপ্তাহান্তে ৫২/৫৩ হিসেব নিকেষে মশগুল থাকেন আর যাকে যাকে যে যে খাতে খরচ করতে দেন...তার হিসেব বুঝে বাকি পয়সা গুনে গেঁথে ফেরত নেন। তখন তাকে মহারাজের বদলে মহাজন বলেই বোধ হয় আমার।
কিন্তু পরন্তু একটাই কথা,দিন কতক পরে শুনি দূরাভাষের ওপারের রুপা বাহিনী শীতের ছুটিতে আমাদের সাথে ঘুরতে যাওয়ার কাহিনী লিখতে বদ্ধপরিকর।আর তার আলোচনার শুরুয়াত করেই ফেলেছে আমার কর্তামশাই এর সাথে।এদিকে ডাক্তার বাবু তখন কলার তুলে নানান শর্ত আরোপে মেতে উঠেছেন। শর্ত আর কিছুই না ,পকেট বুঝে ১/২ দিনের মধ্যের ঝটিতি সফর। তবে রুপাদের আরো খান কতক বেশি দিন হলেও অসুবিধা ছিল না। ছুটি আর পকেট সাথেই ছিল । কিন্তু একসাথে যাওয়ার মজা বজায় রাখতে ওরা আমাদের মন খারাপের সুরে বাঁধা পড়তে দিল না । তবে ঠিক হল তৎকালে টিকিট কেটে আমরা যাব আমাদের পাশের রাজ্য উড়িষ্যা তে কারণ কুঝিকঝিকের টিকিট তখন বাড়ন্ত। আমাদের শীতকালীন বেড়ু বেড়ু পাত পেড়ে বসবে উড়িষ্যার এক তুলনামূলক অজানা সমুদ্র সৈকত ডুবলাগড়ি তে,সাথে আরো কিছু ধর্মকর্ম জুড়ে টইটম্বুর প্ল্যানিং।
দিন গড়িয়ে গড়িয়ে সময় যখন পৌঁছে গেল তৎকালের দুয়ারে, হঠাৎই হাজির টিকিট হীন দুশ্চিন্তা !!! হোটেল যেখানে আমাদের জন্য অপেক্ষারত,ট্রেনে সেখানে ঠাঁই নাই ঠাঁই নাই অবস্থান। মন ভার হয়েও হল না ,আমাদের মুশকিল আসান দাদা ( আমার ভাসুর ঠাকুরের) হাতযশে ঘন্টা দুয়েকের মধ্যেই গাড়ির ব্যবস্থা হল। রূপাদের বাড়ির উত্তপ্ত বাতাবরণে গাড়ি প্রাপ্তির খবর শান্তির বাণী বয়ে আনল। আমরা গোছাগুছি করে পরের দিন ভোর ভোর গাড়ি বোঝাই হয়ে বেরিয়ে পড়লাম বালাশোরের পথে । সাথে আমার বানানো চকোলেট কেক থাকলেও আমরা কোলাঘাট পৌঁছনোর কিছু আগেভাগেই জলখাবারের পাঠ মেটাতে নেমে পড়লাম বেশ কিছু বছর আগে গড়ে ওঠা "আনন্দ" নামক খাবারের দোকানে।
ভাগে যোগে ভিন্ন ভিন্ন খাবার খেয়ে আমরা খড়গপুরের পথ ধরে এগিয়ে , বাংলা ছাড়িয়ে উড়িষ্যাতে ঢুকে পড়লাম। ঝকঝকে দিন ও মসৃণ পথে মন ভালো করা গান গল্প চলতে লাগল ভাগে যোগে। পুপে ও তার বন্ধু সিদ্ধার্থ তাদের পছন্দের গানে আর অপরদিকে আমরা আমাদের পছন্দের গানের ভেলায় ভাসতে ভাসতে এক সময় বালাসোর লেখা একখান বোর্ড কে বাঁ দিকে রেখে এগিয়ে চললাম আরো সন্মুখ পানে।
আমাদের গন্তব্য ডুবলাগড়ি , উড়িষ্যার বালাসোরে অবস্থিত এক নির্জন সমুদ্র সৈকত। খুব পরিচিত না হলেও, নতুন নতুন জায়গা explore করার তালিকায় এই সৈকত আস্তে ধীরে নিজের জমি শক্ত করছে। তবে আগামী দিনে যে এখানকার নির্জনতা কলরবে হারিয়ে যাবে , সে বলাই বাহুল্য। সেটা অবশ্যই দুঃখজনক।এক সময়ে হাইওয়ে ছেড়ে নিতান্তই সাধারণ মেঠো অপরিসর পথে আমাদের গাড়ি এগিয়ে চলল। গ্রামের বাড়ি , দরমার বেড়া, পুকুরে ফোঁটা পদ্ম বন দেখতে দেখতে আরো এক পথের বাঁকে বাঁশে বাঁধা সাইনবোর্ডে আমাদের হোটেলের নাম "আইকন অফ দা সী"দেখে বুঝলাম....আমরা গন্তব্যের প্রায় প্রায় দুয়ারে এসে গেছি। একটু এগিয়েই দেখতে পেলাম আমাদের হোটেলের প্রশস্ত ফটক।
গাড়ি থেকে নেমে একটু হাত পা ছাড়িয়ে নিয়ে আমরা হোটেলের রিসেপশনে হাজির হলাম। পথময় বিছানো বালির আস্তরণ আমাদের সমুদ্রের নৈকট্যের আভাস দিল । যদিও হোটেলে ঢোকার গেট পেরিয়ে যে পথ আরো সামনে এগিয়ে গিয়েছে সেখান থেকে সমুদ্র দৃশ্যমান ছিল না। রিসেপশনে আমাদের আগে পরে আরো অনেক বাঙালি দলে দলে ঝোলা ঝুলিয়ে হাজির হয়েছিলেন ও হচ্ছিলেন। যার যার ঘরের দখল পেতে কিঞ্চিত বিলম্ব হলেও শেষমেশ ঘর মিলল। আমাদের ঘর কিছু গন্ধযুক্ত হওয়ায় খানিক বাকবিতণ্ডার পর্ব মিটিয়ে আরেকখান গন্ধহীন ও ঠিকঠাক ঘর মিলল। রিসেপশনের পিছন থেকে প্রশস্ত বাঁধানো চত্বর পেরিয়ে একদিকে সারিবদ্ধ ঘর , মাঝে খাবার ঘর পেরিয়ে সুইমিং পুল, আরো পরে মাথা ঢাকা অনুষ্ঠান করার ব্যবস্থাপণা।ঘরে থিতু হতেই পেলাম ওয়েলকাম ড্রিংকস.... স্ট্র সহ ডাব,সমুদ্রের ধারে এর থেকে ভালো ওয়েলকাম ড্রিংকস কি আর হতে পারে ????
সকলের স্নান পর্ব মিটিয়ে আমরা চলে এলাম খ্যাটন পর্বে যোগ দিতে। ভ্রমণকারীদের কিছু জন এসেছিলেন অফিস থেকে দল বেঁধে। কিছু এসেছিলেন আমাদের মতন পরিবার পরিজন সহ । অফিস থেকে আগত দলটি র সদস্যরা অল্প বয়সের উন্মাদনায় ভরভরন্ত। তাদের অনুরোধে হোটেল কর্তৃপক্ষ সেই দিন ও রাতে গানের সাগরে আমাদের হাবুডুবু খাইয়ে দিয়েছিল। তাদের নাচ,গান আর স্নানের ( সুইমিং পুল)জোয়ারে আমাদের পুরো ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি হাল হয়েছিল। আর সত্যিই আমরা পরের দিনের থাকার ভাবনা অন্যত্র ভাবতে বাধ্য হয়েছিলাম।
এলাহী খাওয়া দাওয়া সেরে নিতে নিতে ই দেখি বেলা বয়ে যায়। একে ভোরে ওঠা , পথশ্রম সব মিলিয়ে ক্ষিদের বহরের সাথে পাল্লা দিয়ে ওড়িয়া ঠাকুরের রান্না করা মন পসন্দ বিস্তারিত পদ... বেলা তো বয়ে যাবেই। উড়িষ্যার এই রাঁধুনি ঠাকুরের এককালে বাঙালি যৌথ ও বর্ধিষ্ণু পরিবারের রান্না ঘরে একচেটিয়া আধিপত্য ছিল। যার কথা আমরা সাহিত্যের আঙিনায় যেমন পেয়েছি , তেমন শুনেছি মায়ের কাছ থেকে তাঁর ছোটবেলার গল্প গাঁথা থেকে শুনে। মায়ের দেশ বাংলাদেশের যশোরে হলেও , মায়ের মামা বাড়ি ছিল খোদ কলকাতার লেক মার্কেট অঞ্চলে। সেই মামা বাড়ির রান্নাঘরে একাধিপত্য ছিল ওড়িয়া ঠাকুর মনোরঞ্জন ওরফে মনা র । সে যখন ধরে অর্থাৎ কিনা মন দিয়ে রান্না করত তখন তার স্বাদ ছিল অমৃত সদৃশ। কিন্তু মনা যেদিন রাগ করে অথবা মন খারাপ করে ছেড়ে রান্না করত সেদিন তা পাতে দেওয়ার মতন হোতো ই না। মন খারাপে বা রাগের কারণে কোন কাজই বা ভাল হয় ? যাক সে সব কথা । এখানের সুস্বাদু রান্না খেয়ে সকলে ঘরে না ফিরে হোটেলের মাঝের প্রশস্ত চত্বরে খানিক হাঁটা চলা করে , ছবি তুলে,বিকেল বিকেল চললাম সেই ব্লগে দেখা নির্জন, নিরালা সাগর বেলায়। হোটেল থেকে বেরিয়ে বাঁ দিক বরাবর বালি ভর্তি পথ পেরিয়ে এগিয়ে গেলাম। অল্প কিছু বেড়া ঘেরা বাড়ি ঘর পেরিয়ে দুদিকে বিস্তৃত ঘন ঝাউ বন চোখে পড়ল আর সেই ঝাউ গাছের সারির মাঝ দিয়ে অপূর্ব সমুদ্রের হাতছানি দেওয়া ডাক যেন সকলেই শুনতে পেলাম। কিন্তু ঝাউবন পেরিয়ে যখন সমুদ্রের কাছে গেলাম অদ্ভুত এক বৈপরীত্য চোখে পড়ল .... যা আর কোনো সমুদ্র সৈকতে দেখিনি । সমুদ্রের ধারে ছিল না কোন হাওয়া, না ছিল পরিচিত শোঁ শোঁ শব্দ। দূরে একখান জেলে নৌকা , খানিক দূরে ঝাউ বনের মাথায় সূর্যের অস্ত যাওয়ার রূপ ... সবটা যেন পটে আঁকা ছবির মতন আমাদের শান্ত করে দিল । এমন কি খান দুয়েক সারমেয়কে দেখলাম তারাও ভয়ানক ভাবুক মুখে একজন সমুদ্র দেখছিল আরেকজন দেখছিল ঝাউবনের ওপর আঁধার নেমে আসার রূপ কে । ভিজে বালুকাবেলায় হেঁটে, পা ভিজিয়ে, রূপা আর আমি পা মেলাতে গিয়ে ছবি তোলার স্টাইলে উল্টে পড়তে পড়তে তা সামলে নিয়ে আধো আলো ছায়াতে হোটেল মুখি হলাম।
ফিরে এসে দেখি সন্ধ্যাকালীন আয়োজনে হোটেলময় ব্যস্ত সমস্ত ভাব। কর্মী সংখ্যার অনুপাতে বোর্ডারের সংখ্যাধিক্য একদিকে যেমন ব্যবসায়িকভাবে মালিককে আনন্দে আত্মহারা করেছে , অন্যদিকে কর্মীদের করেছে পাগল পারা। শুনলাম মালিক নাকি বঙ্গ সন্তান, নিবাসও বঙ্গেই। বাঙালির নাকি ব্যবসা হয় না ?? কে বলেছে ? যাদের হয় তাদের দিব্য হয়।
শীতের কামড় এ দিকে যে বেশ বেশি , সেটা বেলা বয়ে যাওয়ার আগেই টের পাওয়া যাচ্ছিল। এবার আঁধার নামতেই শীত একদম ঝাঁপিয়ে কাঁপিয়ে একশা করে হাজির হল , আমরা খানিক খানিক ঘরে , খানিক বাইরে যাওয়া আসা করে আড্ডা বাজিতে শান দিতে থাকলাম। ঘরের পরিসর ছোট, তাই খানিক সেখানে থেকে গল্প করতে না করতেই বাহির পানে চোখ মেলে মন সেদিকে নিয়ে যাচ্ছিল, আবার বাইরে কিছু সময় আড্ডা জমে উঠতে না উঠতেই অফিস পার্টি র নাচাগানা সাথে শীতের দাপাদাপি ঘরের দিকে নিয়ে যাচ্ছিল। এর মধ্যেই একবার ঘরের আসরে আমার তৈরি করে চকোলেট কেকের সদ্ব্যবহার করা হল। সময় যখন রাতের খাবার ঘরে নিয়ে গেল হাত ধরে , তখন আমরা সব ঠাণ্ডাতে জমে যাব যাব করছি ... ওদিকের নাচ গান তখন রঙিন জলের প্রভাবে লাগামহীন হয়ে আমাদের ভাবিয়ে তুলছিল। আমরা পরিবার পার্টির রা পত্রপাঠ খেয়ে ঘরে ঢুকে দোর দিয়ে সোজা কম্বলমুখী হয়ে কম্বল মুড়ি দিলাম। ঠাণ্ডা, জার্নি সবের ধকলে সকলেই ঘুমের মাঝে একেবারে তলিয়ে গেলাম।
পরের দিন সকালে উঠে প্রথমে ই ঝপাঝপ স্নান সেরে নিয়ে ঘরের বাইরে বেরিয়ে পড়লাম। দেখলাম অপার শান্তি বিরাজমান চারিদিকে। রাতের হৈচৈ দল ঘুমের দেশে । আমাদের আসে পাশের পারিবারিক ভ্রমণকারীদের ঘুম ভেঙেছে, তারাও চায়ে পে চর্চায় রত। এক ভদ্র মহিলাকে বলতে শুনলাম... " সারা জীবনের গান কাল একদিনেই শুনে ফেলেছি " । না হেসে পারলাম না। তবে সর্বৈব সত্য বচন। বাপ রে !!! যা নাচাগানা র ধূম দেখেছি আগের দিন হোটেলে ঢোকা ইস্তক .... বলার না। আগের দিন দুপুরের পর থেকেই অনেক চেষ্টায় আমরা বালাসোর শহরে এক পাঁচ তারকা খচিত হোটেলে নিজেদের দখলদারি নিশ্চিত করেছিলাম , এখানকার নানান কারণে ব্যতিব্যস্ত হয়ে। কাজেই সকালে মেজাজ সবারই ছিল বেশ ফুরফুরে। আমরা সব ঠিকঠাক করে নিয়ে শান্ত পরিবেশে ছবি বন্দি হতে ও করতে লেগে পড়লাম। হেনকালে আগের রাতের নাচাগানা খ্যাত গায়ক , বাদক ( চেয়ার , টেবিল যখন যেমন ) , নর্তক কূল জাগ্রত হয়ে ঘরের বাইরে এলেন। আমাদের ধারণা ছিল এদের দিন শুরু হবে বলা করে , তাই যারপরনাই শঙ্কিত হলাম। আমার কর্তা মশাই একজনের কুশল বিনিময় করতে দেখলাম সে জন লাজুক মুখে উত্তর দিয়েই ঘরে সিধিয়ে গেলেন ... বুঝলাম ... আগের দিনের পেটে বিশেষ পানীয় পড়ার প্রভাব সকালে আর নেই কো !!! তাই এরা একটু যেন বিব্রত। তবে তা সাময়িক নাকি তা নয় , তা বিচার করার আমরা কেউ নই। আর অবশ্যই এ কথা বলতে হবে , তারা তাদের মতন হৈচৈ করলেও, বাকি কোন বোর্ডারকে অসন্মান করেননি। আমরা চটজলদি জলখাবার খেয়ে বালাসোর শহরের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়লাম।
Comments
Post a Comment