বেড়াতে গিয়ে মজারু ৭০

 বেড়াতে গিয়ে মজারু ৭০

গত শীতের শেষে এক এক করে ঋতুদের আসা যাওয়া চলতে চলতে আমরা আরেক শরৎ এর দুয়ারে এসে হাজির হলাম। এই নিয়ে বছর দুয়েক পূজোর ঢ্যাং কুড়াকুড়ের মধ্যেই আমরা শহরকে টা টা করে...চলো যাই চলে যাই , দূর বহুদূর করা শুরু করেছি।গত বছর বেড়িয়ে ,ঘরে ফেরার পর থেকেই উচ্চ গ্রামে কেরালা যাওয়ার কথা আমাদের টিম এগারোতে আছড়ে পড়লেও , শেষমেশ তা এক বিশেষ প্রকার কারণ জন্য ছত্রভঙ্গ হল , সাথে আমাদের টিমের জনা কতকের মন ভেঙে খান খান হলো। তার মধ্যে এই অধম আছি বটে !!! ভাঙা মনের টুকরোগুলো টুক টুক করে জুড়লো তখনই, যখন নতুন আরেক দিশা  বাকেট লিস্ট থেকে উঁকিঝুঁকি করে বাইরে বেরিয়ে পড়ল। স্থান ঠিক হল।  ভারতের হৃদয় বলা হয় তাকে। হ্যাঁ .... ঠিক ধরেছো, Heart of India, Madhyapradesh । তবে এ কথাও ঠিক,একবারে আমাদের ভারতবর্ষের কোন রাজ্য গোটা ঘুরে দেখার ছুটি মেলা অসম্ভব।অখণ্ড অবসর জীবনে আবার ছুটির দেখা মিললেও শরীর তার সাথে জুটি বাঁধতে বাঁধ সাধে তখন !!! 

অগত্যা আমরা জায়গার লিস্ট কেটে ছোট করে , ভাগ যোগ করে ঘুরতে যাওয়ার spot নির্বাচন করি সব সময় । এবারে খান দুয়েক আইটেনারি বানিয়ে শেষমেশ একখানা আইটেনারিতে সকলের আই (eye) set করে বাদবাকি ছানবীণ শুরু করা হলো।দল ১১ র মোটু-পাতলুর সব বিষয়ে আলাপ আলোচনা, কখনো বা সাক্ষাতে করে , কখনো দূরাভাষে করে ভেসে গেল সব রকম নিত্য কাজকর্মকে সাথে নিয়ে। একজন দাদার সাথে পরামর্শ করে,তো আরেকজন ভাই এর  গাইডের ভূমিকায় হাল ধরে থাকে । এ ভাবে সব রকমের টিকিটের  টিকি ও বুকিং এর দায়িত্ব বুক পেতে সামলে নিল আমাদের টিমের অনিন্দ্য। পিছনে ও পাশে আমার কর্তা মশাই র‌ইলেন। মানসিক সাথী আমরা তো ছিলাম‌ই। এবারে টাকা বাচিয়ে এক পিঠ আমরা কু ঝিক ঝিকে চাপার আয়োজন করলাম। মাঝের আরেক দূরত্ব অতিক্রমেও ট্রেনের ওপর দায় বর্তালো। কারণ বিভিন্ন ট্রাভেল ব্লগ দেখার সুফল স্বরূপ আমার কর্তা মশাই এ ব্যাপারের সদর্থক ভাবনা সবার মধ্যে চারিয়ে দিয়েছিলেন। এরপর ট্রেনের দীর্ঘ যাত্রার জন্য বিস্তারিত পৈটিক খ্যাটনের আয়োজন ও ঘোরার সাজসরঞ্জাম সহ যথা সময়ে আমরা লট বহর নিয়ে সপ্তমীর সকালে হাজির হলাম হাওড়া স্টেশন চত্বরের হট্টমেলায়।

একে একে সকলে হাজির হয়ে স্টেশন চত্বরের অনেকখানি মালপত্তরে ভরিয়ে ফেললাম, খানিক পর ট্রেন প্ল্যাটফর্মে গদাই লস্কর চালে হাজির হতে , আমরা সব কিছু সহ নিজেরা ট্রেনে উঠে , নিজ নিজ এলাকা বুঝে নিয়ে সংসার সাজিয়ে ফেললাম। বাঙালি একটু দীর্ঘ মেয়াদী যাত্রায় ট্রেনের কামরাকে একদম অন্য একখান ঘরোয়া লুক দিতে সিদ্ধহস্ত !!! ব্যাপার খান সহজাত। মহিলা কূলের থেকে পুরুষগণ বেশ এগিয়ে এক্ষেত্রে। বেশ কিছু পুরুষ যাত্রীকে ট্রেনে উঠেই ঘরোয়া পোশাক ও চপ্পল পরে চটর পটর করে এদিক সেদিক ঘুরতে দেখেছে সক্কলে !!! প্রতিবারেই !!!! এবারেও তার ব্যতিক্রম দেখলাম না।আমার কর্তা মশাই বপুর আকার আয়তনের কারণে পোশাক বদলের হ্যাপায় যান না , ভাগ্যিস !!! তবে চপ্পল বিলাসী হয়ে থাকেন। এবারেও হলেন। এই সব গোছাগোছির মধ্যেই ট্রেন একখান দুলুনি সংকেত দিয়ে চলা শুরু করল। 

আমরা চলেছিলাম ... জব্বলপুর গামী শক্তি পুঞ্জ এক্সপ্রেস চড়ে। তার পুঞ্জীভূত শক্তি যে , কিঞ্চিত গোলমেলে, তা পরে সকলের মালুম হল। ট্রেনের গতি বাড়ার সাথে সাথেই দেবাশ্রিতার ক্যাটারিং সার্ভিস চালু হল । প্রথম পাতেই পড়ল সস সহোযোগে ফিস ফ্রাই(ওর্ডারি খাবার)। গনগনে গরম না হলেও... তা মিনমিনে গরম‌ও না। হাল্কা মিঠে রোদের মতন আরাম দায়ক , মৃদু গরম ফিস ফ্রাই। ফিস ফ্রাই খানিক পৈটিক আস্তানায় পৌঁছে গেলে আমরা so called দুপুরের খাওয়া শুরুর তোড়জোড়ে লেগে পড়লাম গড়ানে বেলার দিকে। কোন সকালে , সকলে খেয়ে বেরিয়েছি , ক্ষিদে পায় না বলো ? আমার ঝুলি থেকে প্লেট আর চিলি চিকেন ( ওর্ডারি খাবার ) বেরিয়ে পড়তে , তাকে যোগ্য সঙ্গত করতে হাজির হল শান্তশ্রী দির হোম মেড ঝরঝরে ফ্রায়েড রাইস। শেষ পাতে অণ্বেষার আনা মিষ্টি। আহা !!! মন‌ ও পেট সব ভরভরন্ত হয়েও কিছু খাবার রয়ে গেল। আমরা রাতের জন্য তা গুছিয়ে তুলে রাখলাম। আমরা সবাই ভারি লক্ষ্মীমন্ত কিনা !!!! যদিও রাতের মেনু ভিন্ন। 

দুই বান্ধবী আর খুশি বোনু গোড়াতেই আপার বার্থে তাদের আসর জমাতে চলে গিয়েছিল, কাজেই নিচে আমরা এদিকে ওদিকে মিলিয়ে জুলিয়ে আড্ডায় বসে গেলাম। আমাদের খুদে সদস্য হিল্লোল, আমাদের মাঝেই র‌ইল। ট্রেনের দুলুনি বেশ লাগে আমার, সাথে জানালার বাইরের জগৎ সংসারের দুরন্তপনা ভরা গতিময়তা ভীষণ ভালো লাগে। এ গল্প ও গল্পের মাঝে পাশের যাত্রী এক ইতিহাস অধ্যাপকের সাথে আলাপ হল, ওনারা সপরিবার ও বন্ধু পরিবার সহ চলেছেন হালুম দর্শনে বান্ধব গড়। মধ্যপ্রদেশ যাচ্ছি শুনেই , অনেকের মনে এই প্রশ্নের আনাগোনা হয়েছে, যে আমরা কি মামাকে ( সকাশে ) দেখতে যামু ??? আরে বাবা , মামা মামী জায়গা মতন থাক, আমরা অন্যত্র বেড়িয়ে আসি । মধ্যপ্রদেশ জুড়ে সমুদ্র আর মরুভূমি বাদে সব রকমের ভূগোল, ইতিহাসের মেলাই অবস্থান। কাকে ফেলি আর কাকে রাখি ???? 

খাবার খানিক যথাস্থানে থিতু হতে না হতেই আমাদের দেবাশ্রিতা মুড়ি মাখার সরঞ্জাম সাজিয়ে ফেলল , সাথে আমি কমন। দেবাশ্রিতা সুগৃহিনী , সব কিছুর মধ্যে ছোট্ট এক খান শিশিতে সর্ষে তেল আনা করেছিল, তবে আমি ডাক্তার গিন্নি হঠাৎ ই স্বাস্থ্য সচেতনতা দেখিয়ে ট্রেন জার্নিতে আর তেল দিতে দিই নাই। পাড়ার পূজোর অনুষ্ঠান আয়োজনের কারণে দেবু কাঁচা লঙ্কা, শশা, পেঁয়াজ না আনার দুঃখে ব্যাকুল হলেও, করার কিছু নেই। আর ওসব ছাড়াও বাকি সব বাদাম, চাল ভাজা , ঝুরি ভাজা সহযোগে নেহাৎ মন্দ হলো না সান্ধ্যকালীন খাই দাই। ট্রেনে খুশির হেরিটেজ স্কুলের অঙ্কের দিদিমণি ছিলেন, দেখা হল । সময় টুক টুক করে পেরিয়ে যেতে যেতে শুনলাম যে , ট্রেন নাকি কিঞ্চিত বিলম্বিত লয়ে চলছে !!! এতো রকমের ধরনের খাবার সাথে নেওয়ার অন্যতম কারণ ... ব্লগারদের কথা অনুযায়ী ধানবাদের পর কোলিয়ারী বেল্ট পার করার সময়ে খাবার পাওয়ার সম্ভাবনা নেই। আর এই ট্রেনে প্যানট্রি কার নেই । তবে অ্যাপের কল্যাণে খাবার  অর্ডার করলে যে , কিছু কিছু স্টেশনে ডেলিভারি হয় , তা জানা ছিল। সেসব অ্যাপ মারফত পরের দিনের দুপুরে খাবার ব্যবস্থা করার ভাবনা ভাবাই ছিল।কারণ জলখাবারের টুকটাক বন্দোবস্ত সাথেই ছিল। যদিও একটু ঘেঁটে ছিল , কিন্তু ঘোঁট পাকাতে মোটেও দিই নাই। যাইহোক মুড়ি সকলের ভুঁড়িতে মিলিয়ে যাওয়ার আগেই রাতের জোগাড় যন্ত্রে সামিল হলাম ... মেনুতে শান্তশ্রী দি র হোম মেড আলুর দম আর অণ্বেষা র বাড়ি থেকে আনা রুটি তো ছিলই, সাথে দুপুরের ফ্রায়েড রাইস ও চিলি চিকেন (ওর্ডারি) আমরাও আছি বলে যোগ দিতে এক জম্পেশ খাওয়া দাওয়া হলো । শেষ পাতে ছিল অণ্বেষা র আনা মিষ্টান্ন। এরপরে কে কোথায় শুতে উঠবে , যা নিয়ে বিস্তর মতান্তর সহ মনান্তর হতে লাগল , আমি চুপচাপ হাল চাল বুঝতে বুঝতে প্রমাদ গুনতে লাগলাম, যদি আপার বার্থ আপন করতে হয় , কেলেঙ্কারি!!!! উঠতে ভারি সমস্যা। নামতে পারি টুক করে , কিন্তু উঠুম কেমনে ? আমার সেই পুরাতন গপ্পো। স্কুলের ড্রিল দিদিমণির কাছে ফরোয়ার্ড রোল পারতাম না , কিন্তু ব্যাক‌ওয়ার্ড রোল পারতাম। বান্ধবী পারমিতা... ব্যাপারটা জেনে অবাক হয়ে বলেছিল ... "তুই আগে যোগ করতে শিখেছিলি নাকি বিয়োগ ??? " 

হেনকালে বিপদ কাটল , আমি আর অণ্বেষা পাশাপাশি নিচের বার্থে শুয়ে পড়লাম। নিশ্চিন্তে .... । ওপরে , সাইডে , পাশের সকলে র‌ইল। দুলুনিতে আমার ঘুমের সমস্যা হয়না , নানান শব্দ ছাপিয়ে ট্রেনের নিরন্তর গতির শব্দ শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে পড়লাম এক সময়ে। অণ্বেষার ট্রেনে ঘুম হলো না, নতুন যাওয়ার সঙ্কোচ, অনভ্যাস সব মিলিয়ে যতবার চোখ খুলেছি, ওকে জাগন্ত দেখেছি ... । একসময় পুপে তার পাপার সাথে কথা কয়ে , চলল টয়লেটে। খ্যাটনের বহরে হবে বা !!! ঘুম , জাগরণের মাঝে বুঝলাম মা আমার ওপরের  বার্থে আর উঠতে নারাজ , আমি টয়লেট ঘুরে এসে দেখি , আমার শয়ন আসন জবরদখল হয়ে গেছে। জবরদখল কারী আমার কন্যা। নাও এবার তার বাবা তো তার হয়েই কথা ক‌ইবে। আর আধা ঘুমন্ত, আধা জাগন্ত আমাকে ঠেলে ঠুলে জোর করে আপার বার্থে তুলে তবে কন্যার পিতৃদেব শান্ত হলেন । খানিক পর নিদ্রা গেলাম বটে , কিন্তু .... আবার জাগ্রত হয়ে টুক করে নেমে আরেক রাউন্ড টয়লেট ঘুরে এসে দেখি , গোটা কামরা মায় অণ্বেষা ওবধি ঘুমিয়ে কাদা । হরি বোল !!! খানিক মেয়ের পদপ্রান্তে বসে ঝিমিয়ে , মনে জোর নিয়ে আপার বার্থ মুখী হলাম। কিন্তু.... নাহ্। হলো না। হেনকালে অনিন্দ্য জাগ্রত হয়ে আমাকে বসে থাকতে দেখে ... কারণ জেনে ওপরে উঠে যেতে অনুরোধ করা শুরু করলো, বেগতিক দেখে পুপেকে জাগন্ত ও রাগান্বিত করে ওপরের বার্থে পাঠিয়ে দিলাম।নতুবা নির্ঘাত কিছু কেলেঙ্কারিয়াস ঘটনা হোতোই হতো !!! অবশেষে আরাম করে ভোরের কাছাকাছি এসে ঘুমের দেশে ঘুরতে গেলাম। ঘুম ভাঙলো ট্রেনের চিরাচরিত "চায়ে গরম " এর ডাকে। যারা যারা ততক্ষণে জেগেছি চা পানে রত হলাম। জানলাম ট্রেন বেশ লেট করে চলছে । আস্তে ধীরে আপামর জনতা নিদ্রা থেকে ক্ষেপে ক্ষেপে জাগন্ত হলো। সেকেন্ড রাউন্ড চা খেয়ে , প্রাতরাশের আসর বসিয়ে কিছু খাবারের পুনরাবৃত্তি সহ বাকি পদ সহযোগে দুরন্ত ব্রেকফাস্ট হল। অন্বেষার আনা ফলের মধ্যে কলা খান কতক গোল পাকালেও, তাদের পরিষ্কার করে আগেরদিন গোলোযোগ বাড়তে দিই নাই। কাজেই তারা সুন্দর কাজে থুড়ি পেট ভরাতে কাজে লেগে গেল। সাথে যোগ্য সঙ্গত করল আপেল সহ আমার ঘরে তৈরি কেক। আপেল টুক টুক করে ঘোরার শেষ দিন ওবধি কাজে লাগল সুন্দর ভাবে। দীর্ঘ যাত্রার সময় অলস আড্ডা , গল্পের বই পড়া,ঘুম , জাগরণের মাঝে কাটতে লাগল। অনলাইন অ্যাপ ব্যবহার করে দুপুরে ভেজ মিল অর্ডার করা হল। তবে একখান বিষয় সবাই চমকিত হয়ে দেখলাম, সারা পথে খাদ্যের অফুরন্ত সাপ্লাই ছিল , খাদ্যাভাবের ব্লগ ডাহা ফেল মেরে গেল। আমাদের অ্যাপ মারফত অর্ডার করা খাবার এলো যথাসময়ে আর ঘন্টা দেড়েক লেট করে আমরা অতঃপর জব্বলপুর স্টেশনে লটবহর সহ অবতীর্ণ হলাম। মালপত্র গুণে গেঁথে,সব কিছু নিয়ে কসরত করতে করতে স্টেশন চত্বরের বাইরে বেরিয়ে এলাম। অনিন্দ্য র ব্যবস্থাপণায় সেখানে তখন হাজির ছিল ব্র্যান্ড নিউ ট্রাভেরা। এই পরেই শুরু হলো আসল গল্প।

Comments

Popular posts from this blog

বেড়াতে গিয়ে মজারু ৬৮

বেড়াতে গিয়ে মজারু ৬৭

বেড়াতে গিয়ে মজারু ৬৯