বেড়াতে গিয়ে মজারু ৬৯
বেড়াতে গিয়ে মজারু ৬৯
অপরিসর পথ বেয়ে আমরা ডুবলাগড়ি থেকে বেরিয়ে পড়লাম। সেদিন ছিল শনিবার,ফিরতি পথে আরো অনেক বিপরীত মুখী গাড়ি ঢুকতে দেখলাম। বুঝলাম ওই চত্বরে নাচ গান আজ আরো উচ্চ গ্রামে বাঁধা পড়বে। ভাগ্যিস !!! আমরা আগে ভাগেই ওদিক থেকে বেরিয়ে এসেছি। পথের বাঁকে এক পদ্ম পুকুর ঘুরে রাস্তায় আমরা উঠে পড়লাম। ফাঁকা রাস্তার এক পাশে গ্রামের সামনেই পদ্ম ফুলে ভরা শান বাঁধানো পুকুর ঘাট। জলে বিপরীত পাড়ের ঘর বাড়ির প্রতিবিম্ব ... সব মিলিয়ে এক সুন্দর পল্লী গ্রামের টুকরো ছবি যেন। যার মধ্যে মধ্যে শহুরে খণ্ড চিত্র পদচারণা করলেও ঘাঁটি গাড়তে পারেনি আর সেখানেই তার সৌন্দর্য রয়ে গেছে অটুট,অপূর্ব। আমরা ঘাটে নেমে পদ্ম বিলের ছবি তুলতে দ্বিধা করলাম না । নির্জন, রৌদ্রোজ্জ্বল এক সকালে অচিরেই আমরা কয়জন ভবিষ্যতের স্মৃতির রসদ গুছিয়ে আবার এগিয়ে চললাম। গাড়িতে ওঠার মুহূর্তে খানিক দূরের গাছের ডালে বসা এক মাছরাঙা আমাকে ভারি উত্তেজিত ও উৎসাহিত করে তার ফটো তুলিয়ে নিল। যদিও ক্যামেরা বাড়িয়ে তার লেন্স পরিবর্তন করতে হলো , তবুও এই সব খাজনা বাজনার পুরো সময়টা , সে স্থির হয়ে বসেই রইল ডালে। যা দেখলাম,যুগের প্রভাব পরেছে প্রাণী কূলের ওপরেও !!! আরো ঘন্টা খানেকের মধ্যেই বালাশোরের তারকাখচিত হোটেল নীলাদ্রি ইন এ পৌঁছে গেলাম আমরা।সব লাগেজ রেখে এরপরই আমরা আমাদের পরবর্তী গন্তব্য পঞ্চলিঙ্গেশ্বরের দিকে যাত্রা করলাম।
পঞ্চলিঙ্গেশ্বর সম্বন্ধে কথিত আছে যে রাম যখন অনুজ লক্ষণ ও সহধর্মিণী সীতা সহ ১৪ বছরের জন্য বনবাসী হয়েছিলেন। এই নীলগিরি সংলগ্ন বনের মধ্যে পাহাড়ের ওপরে পাঁচ টি শিবলিঙ্গ স্হাপন করেছিলেন পূজো করার জন্য। পৌরাণিক গল্প গাঁথা যাই থাকুক না কেন, ওদিক পানে যাওয়ার পথে আমার কর্তা মশাই হয়ে উঠলেন ভয়ানক স্মৃতি মেদূর ... তেনার কলেজ জীবন জুড়ে রয়েছে নানান ঘুরে বেড়ানোর আনন্দ ঘন কাহিনী। আর সেখানে পাকাপোক্ত আসন পেতে ছিল এই উড়িষ্যা। কি নেই সেখানে ? মালভূমির টিলা ( ছোট্ট পাহাড় ) , জঙ্গল , সমুদ্র সৈকত .... নিজ রাজ্য ও আরো অন্যান্য রাজ্য যে ছিল না তা নয় , তবে পকেটে যেখানে চাপ কম পড়বে ছাত্র জীবন যে সেখানে ঝাঁপাবে আর কাঁপাবে এ আর নতুন কথা কি ? তখন নাকি পঞ্চলিঙ্গেশ্বর ছিল অনেক বেশি প্রকৃতি অন্ত প্রাণ। ট্রেকিং করে পাহাড়ি পথে তেনারা গিয়েছিলেন ধর্ম কর্ম করতে । ওঠার পথের ধারের এক গাছে এক সোজা সরল বন্ধুকে দুষ্টুমি করে উৎসাহ দিয়ে তুলে দিয়ে ... সকলে তার মনে ভয় ধরিয়ে , তাকে না নামিয়ে দুয়ো দিয়েছিল খানিক এগিয়ে গিয়ে... বন্ধুকে গাছের ওপর থেকে বিস্তারিত প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখার লোভ দেখানো হয়েছিল। পরে খানিক মজার পাট চুকিয়ে বন্ধুরা তাকে আবার সযত্নে নামিয়েও নিয়েছিল। সে বন্ধু তখন মহা চটিতং .... খুব স্বাভাবিক ভাবেই ।
এখন যুগের সাথে তাল মিলিয়ে গড়ে উঠেছে ৩১৩ খান বাঁধানো সিঁড়ি, যা পাহাড় ও মাঝে মাঝে দৃশ্যমান ঝর্ণার পাশ দিয়ে ওপরে উঠে গিয়েছে। মধ্যে মধ্যে বসার ব্যবস্থাপণা থাকলেও খুব পরিচ্ছন্ন নয় তা । আমরা হোটেল "নীলাদ্রি ইন"থেকে বেরনোর সময় খেয়ে না বেরনোর ফলে তখন স্পষ্ট বুঝলাম যে , খেতে বিস্তর বিলম্ব হবে । আমাদের মধ্যে রূপা ... অত্যন্ত ভক্তিমতি আর ভক্তির কারণজন্য যে অদ্ভুত শক্তিমতি তা চাক্ষুষ করলাম সকলেই। সকলে উৎসাহে ভর দিয়ে ৩১৩ খান সিঁড়ি উঠে এক অপরিসর চত্ত্বরে জুতো অরক্ষিত রেখে শুনলাম আরো ঘন্টা দুয়েকের অপেক্ষার প্রহরে তা দিতে হবে মূল পঞ্চ লিঙ্গের দর্শনের জন্য। সকালে ডুবলাগড়িতে
খাবার ততক্ষণে হজম হয়ে নতুন টাটকা ক্ষিদের বার্তা বহন করে আমাদের কাতর করে তুললেও ভদ্রমহিলার এক কথা .... এতদূরে এসে দেখব না ? তাও খাবার জন্য ? পূজো দিয়ে তবেই খাব। অগত্যা .... আমরা ৩১৩ সিঁড়ি উঠে আবার অপেক্ষা করতে ৩১৩ ভেঙে নিচে নেমে এলাম, কারণ শেষদিকের লাইন খান আবার খানিকটা ওপরে উঠে নিচে নেমে পাহাড়ি গুহাতে ঢুকে তবে দর্শন করতে পারবে ভোলানাথের । আর সেখানকার ভিড় দেখে আমরা যথারীতি ভড়কে গেছি !!! সিদ্ধার্থ মাকে নিয়ে ভয়ানক চিন্তিত, সাথে চিন্তার শেষ প্রান্ত ধরে খানিক নেমে দিবাকর ফের ঊর্ধ্বমুখী হতে আমরা দেবাদেবী দুই ছানাকে নিয়ে নিচে নামতে শুরু করলাম। নিচে নামতেই আশেপাশের দোকান পাঠ দেখে আমার কেনা কিনি করার ব্যারাম চাগাড় দিয়ে উঠল। যাওয়ার সময়ে ভাবনায় যারা ধরা দিয়েছিল চোখের চাহনি র হাত ধরে , তাদের আপন করতে লেগে পড়লাম। কিছু পরে দেখি তিনি দুই ছানা সহ গায়েব, রূপা তখনো দিবার হাত ধরে ধর্ম কর্ম করে দৃশ্য পটে ধরা দেয়নি। অগত্যা সামনের দিকে এগিয়ে চললাম। কিন্তু শুধু খুঁজি আর খুঁজি দেখতে নারি। শেষ ভরসা স্থল হাতে নিলাম ... হ্যাঁ, একদম ঠিক ধরেছ ... মোবাইলে কল করেই ফেললাম। সমাধান ভদ্র ওদিক থেকে সমাধান বাতলে দিল ... আর কতখানি এগিয়ে যেতে হবে তার হিসেব নিকেশ। দেখা পেলাম অবশেষে , দুই ছানা সহ তিনি ছোলা , শশা, টমেটো ইত্যাদি সহযোগে চটপটা চাট দিয়ে পৈটিক খাই খাই কে ঠাঁই নাড়া করছেন। আমিও লেগে পড়লাম। হেনকালে দিবাকর আর রূপাকে দেখতে পেলাম, তার আগে ফোন মারফৎ আগমন বার্তা রটে গিয়েছিল। পুরো ... " আমার হাত ধরে তুমি নিয়ে চলো সখা " style... পূজো দিয়ে ফেরার পর ভক্তি ভাব কমে ভক্তিমতি রূপা তখন আবার বাস্তবমুখী। তখন দুপুর গড়িয়ে বিকেল সন্ধ্যার দিকে ঢলে পড়ছে .... So called মধ্যাহ্ন ভোজ কারোর হয়নি। তবে বেড়াতে গিয়ে ওমন কম বেশি হয়েই থাকে ... ওমন কতো শত কম কে পরে আমরা পুষিয়েও নিয়ে থাকি ।
আমাদের আরো দুখান spot ঝোলা তে থাকলেও, শরীর জুড়ে তখন ভয়ানক ক্লান্তি। ঠিক হল, আমরা বালাশোরে যে জগন্নাথ মন্দির তৈরি হয়েছে অল্প কিছু বছর আগে .... সেখানকার সন্ধ্যারতি দেখে তবেই হোটেলে ফিরব আর রইল বাকি হাতে গোণা এক, তাকে পরের দিন ভোর ভোর দেখে নেব। কি সুন্দর ও সহজ সমাধান তাই না ???? সূজ্জি মামা পাটে নামলেন, চাঁদ মামা দখল নিলেন কি নিলেন না , তার হদিশ নেওয়ার আগেই আমরা জগন্নাথ মন্দিরের কাছে পৌঁছে নেমে পড়লাম। খানিক এগিয়ে আলোর মালায় সেজে ওঠা মন্দির চত্বরে প্রবেশ করে ,আরতি দেখতে মূল মন্দিরের দিকে পৌঁছে গেলাম। এখানেও রূপা আমাদের ছেড়ে দ্রুতগতি প্রাপ্ত হল ... ভক্ত হয়তো এভাবেই ভগবানের কাছে ছুটে যায় । মন্দির থেকে বেরিয়ে প্রসাদ স্বরূপ ভোগের খিঁচুড়ি খেয়ে আমরা ঘরে থুড়ি হোটেলে ফিরে এলাম।
ফেরার পরপরই আমরা প্রথমেই আমাদের দুপুরের না খাওয়া পুষিয়ে নিতে দেরি করলাম না।পরের দিন ঘরের দুয়ারে ফেরার পালা , কাজেই মন বিষন্ন হতে হতেও তাকে অন্য খাতে বইয়ে দেওয়ার কথা ঠিক করে ফেলা হল .... অন্য খাতে অর্থাৎ অন্য পথে চাঁদিপুর ঘুরে ঘরে ফেরার ভাবনা এক পলকে বিষাদকে হরষে পৌঁছে দিল। এরপর একটু দেরি করে রাতের খাবার খেয়ে আমরা শুতে গেলাম। পরেরদিন ভোরে আমি আর রূপারা তিনজন যাব আগের দিনের বাদ পরা ক্ষীরচোরা গোপীনাথ মন্দির দর্শন করতে .... হরে কৃষ্ণ !!!!
ভোরে উঠে স্নান করে আমি , ওদের সাথে চললাম গোপীনাথের দর্শন করতে। আগের দিন রূপার কাছে এই মন্দির নিয়ে যে কিংবদন্তি আছে তা শুনেছিলাম। এই মন্দিরের প্রসিদ্ধ ক্ষীর প্রসাদ গোপীনাথ চুরি করে সরিয়ে রেখেছিলেন তাঁর অন্যতম সেরা ভক্ত মাধবেন্দ্র নাথ পুরীর জন্য। সকাল সকাল ফাঁকা মন্দির চত্বরে তখন হাতে গোনা কয়েকজন দর্শনার্থী। গোপীনাথের শ্বেত শুভ্র বসন পরিধান প্রক্রিয়া সম্পন্ন করছিলেন এক পুরোহিত মশাই। নমস্কার করে আমরা তিনজন গেলাম নাটমন্দিরে , রূপা গেল ক্ষীর ভোগ কেনার কাউন্টারে। আমরা সব ঘুরে দেখতে লাগলাম। এর মধ্যে পূজোর জোগাড় সম্পন্ন প্রায় প্রায় শেষ হতে দেখে রূপা গেল পূজোর সরঞ্জাম কিনতে। আমি আর সিদ্ধার্থ, দিবাকরের নির্দেশ মেনে আমাদের গাড়িতে ফিরে,অপেক্ষায় থাকলাম। সব সেরে আমরা ৮.৩০/৯টার মধ্যে হোটেলে ফিরে জলখাবারের পর্ব মিটিয়ে সবকিছু গুছু করে চাঁদিপুরের দিকে রওনা দিলাম।
ফের কর্তা মশাই ফেরত গেলেন বিগত কলেজ জীবনে। চাঁদিপুর পৌঁছে সোজা পান্থ নিবাস পানে ধেয়ে চললেন । আমাদের গাড়ি রাখা হল বিশালাকার পান্থ নিবাস চত্বরে। ওখানেই তিনি কলেজ জীবনে এসেছিলেন বন্ধু দের সাথে।গাড়ি থেকে নেমে আমরা চললাম সাগর পানে ।
চাঁদিপুরে প্রকৃতির এক আজব লীলা চলে , আগে ভাগেই তেনার মারফত জেনেছি । এবার সেই শোনা কথার বাস্তবায়ন দেখলাম। সমুদ্র সকাল সকাল জায়গা ছেড়ে দূরে হারিয়ে অর্থাৎ সরে যায়। তখন তুমি নিশ্চিন্তে সমুদ্রের ওপর বলো অথবা জমিতে বলো হেঁটে ছুটে একাকার করে বেড়িয়ে বেড়াতে পারো !!! সঠিক সময়ে, কাঁটায় কাঁটায় , আবার সাগর দা হাজির হবেন সব ভাসিয়ে। আমরা সমুদ্রের জমিতে খানিক ঘুরে ফিরে , ওখানকার এক ডাব বিক্রেতা র থেকে জেনে নিলাম... সমুদ্রের ফিরে আসার সময় । বেলা তিনটে নাগাদ সাগর দা ফিরতি পথে ফেরেন । আমরা ওখান থেকে ফিরে আবার কিছু আটকে গেলাম বেলাভূমির বিকিকিনি র হাটে। তবে আমার সাথে ছিল নানাভাবে বারণ করার লোকাল গার্জেন, এবার তেমন বারণ না করলেও... এক এক জনের উপস্থিতির মহিমা থাকেই থাকে (এ আমার বয়স বাড়ার অন্যতম অভিজ্ঞতা)তার ফলে হাত বেশি খোলতাই না করে গাড়ির পানে রওনা দিলাম। অনেক খানি পথ ফিরতে হবে ... মধ্যিখানে অতি অবশ্যই মধ্যাহ্ন ভোজ সারতে হবে। কিন্তু ..... রূপা বিকিকিনির হাট থেকে পুরো মাদুরময় হয়ে ফিরল আরো খানিক পরে। ওর বাড়ির কাছাকাছি মাদুরদহ.... কিন্তু....তাই বলে !!!! গাড়িতে সব সাজিয়ে গুছিয়ে, আসে মাদুর পাশে মাদুর করে আমরা অতঃপর কলকাতা মুখী রওনা দিলাম, প্রথমেই বালাশোরের হাইওয়েতে উঠে দুপুরের খাবার খেয়ে নিলাম। ঝকঝকে পথ পেরিয়ে সন্ধ্যায় কোলাঘাট ধাবাতে দাঁড়িয়ে কণকণে ঠাণ্ডায় ধূমায়িত চায়ে চুমুক দিয়ে জনতা জনার্দনকে দেখতে দেখতে মনে হল যেন কতো দিন বাড়ি ছেড়ে আছি । এরপর ... অনেক ভিড় , যানজট পেরিয়ে, রাত ৯/৯.৩০ নাগাদ আমরা ঘরে ফিরে এলাম।
Comments
Post a Comment